ডমরুধরের হীরক লাভ।
মেনী গোয়ালা-ছুঁড়ির ঘর ঠিক আমার বাগানের পাশে। ঐ স্থানটাতে আমার বাগানে একটু খোঁচ হইয়া আছে। মেনী ও তাহার ভাই মরিয়া গেলে ঐ ভূমিটুকু আমি লইব। তাহা হইলে আমার বাগানের খোঁচটী ঘুচিয়া যাইবে। তাহারা সত্য সত্যই বোসেদের গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়া মরিবে কি না, তাহা জানিবার নিমিত্ত পরদিন প্রাতঃকালে বেলা দশটার সময় আমি ঘর হইতে বাহির হইলাম। পথে দেখিলাম যে, কেষ্টাদের বাড়ীতে হু হু করিয়া একখানা পাল্কি আসিয়া লাগিল, পাল্কির ভিতর হইতে কেষ্টার ঠাকুরমা বুড়ী বাহির হইল; তাহার পর লাঠি ধরিয়া ঠুক ঠুক্ করিয়া গৃহে প্রবেশ করিল।
বুড়ী কোথায় গিয়াছিল ও কোথা হইতে আসিল, তাহা জানিবার নিমিত্ত আমি সে স্থানে যাইলাম। শুনিলাম যে, গোবর্দ্ধনপুর হইতে একজনদের বৌ লইয়া একখানা পাল্কি নিশ্চিন্পুতর গিয়াছিল। বৌ রাখিয়া খালি পাল্কি সন্ধ্যার পর ফিরিয়া যাইতেছিল। নেকোর দোকানে পাল্কি রাখিয়া বেহারাগণ তামাক খাইতেছিল। সেই সময় কেষ্টার ঠাকুরমা তেল লইতে দোকানে আসিতেছিল। বোরার ভিতরে থাকিয়া যে নেঙটা ভূতটা বলাই চিন্তিকে খাইতে গিয়াছিল, সেই ভূতটা আসিয়া কেষ্টার ঠাকুরমাকে ধাক্কা মারিয়া ফেলিয়া দিল। কিন্তু দোকানে অনেক লোক দেখিয়া কেষ্টার ঠাকুরমাকে লইয়া যাইতে পারিল না। তৎক্ষণাৎ সে বাতাসে মিশিয়া গেল। কেষ্টার ঠাকুরমা উঠিয়া ঘোরতর ভয়বিহ্বল হইয়া, সম্মুখে একখানা পাল্কি ও তাহার দ্বার খোলা দেখিয়া তাহার ভিতর প্রবেশ করিল। তাহার পর দ্বার বন্ধ করিয়া পাল্কির ভিতর সে অজ্ঞান হইয়া পড়িল। বেহারাগণ তাহা জানিতে পারে নাই। বলাই চিন্তির নিকট ভূতের গল্প শুনিয়া তাড়াতাড়ি পাল্কি তুলিয়া তাহারা চলিয়া গেল। রাত্রি দুই প্রহরের সময় তাহারা গোবর্দ্ধনপুর পৌঁছিল। সেই স্থানে গিয়া পাল্কির ভিতর বুড়ীকে দেখিতে পাইল। কিন্তু ভূতের ভরে সে রাত্রিতে বুড়ীকে ফিরিয়া আনিতে পারিল না। কারণ, এ সামান্য ভূত নহে, এ নেঙটা গোরা ভূত। আজ প্রাতঃকালে বুড়ীকে বাড়ী ফিরিয়া আনিল। আমি ভাবিলাম যে, সামান্য -একটা সাহেবের টুপি পরিয়াছিলাম, তাহাতে কি কাণ্ড না হইল। এ সব নষ্ট চন্দ্রের খেলা!
গোয়ালা-ছুঁড়ি মেনীর বাড়ী গিয়া দেখিলাম যে, যাহারা শিশি বোতল ক্রয় করে, সেইরূপ একটা লোক সে স্থানে বসিয়া আছে। ঘরের ভিতর হইতে একটা বোতল ও একটা শিশি আনিয়া মেনী তাহাকে দেখাইতেছে। শিশির ভিতর ছোট এক খণ্ড কাচের ন্যায় কি ছিল। ভিলে তাহা বাহির করিয়া খেলা করিতে লাগিল। আমি দেখিলাম যে, সেই ক্ষুদ্র কাচটাতে পল কাটা আছে, আর সেই পল হইতে নানা বর্ণের আভা বাহির হইতেছে। আমি ভাবিলাম যে, এরূপ কাচ ইহাদের ঘরে কোথা হইতে আসিল, যে স্থান হইতে আসুক, এ সামান্য কাচ নহে। বোতল ও শিশির লোকটা মেনীকে চারিটী পয়সা দিল। ভিলের নিকট হইতে আমি কাচদণ্ড চাহিলাম। ভিলে দিতে সম্মত হইল না। দুই পয়সা দিয়া তাহা আমি কিনিতে চাহিলাম। তথন মেনী বলিল,—“দাও, দাদা দাও। কাচটুকু লইয়া তুমি কি করিবে? ডমরু বাবু দুই পয়সা দিলে আমাদের ছয় পয়সা হইবে। ছয় পয়সার চাউল কিনিলে দুই দিন তোমাকে পেট ভরিয়া ভাত দিতে পারিব।”
ভিলে বলিল,—“বড় ক্ষুধা পাইয়াছে। আমি কলাপাতা কাটিয়া আনি?”
মেনী বলিল,—“না ভাই, এখন নয়। রও আগে নেকোর দোকান হইতে চাউল কিনিয়া আনি, ভাত রাঁধি, তখন কলাপাতা কাটিয়া আনিও।”
শিশি বোতল লইয়া লোকটা চলিয়া গেল। কাচখণ্ড লইয়া আমিও বাটী আসিলাম! মনে করিলাম, কখনই এ সামান্য কাচ নহে। এবার কলিকাতা গিয়া কোন জহুরীকে দেখাইব।
কিন্তু সেই দিন বৈকাল বেলা আমি বিষম গোলযোগে পড়িলাম। কলিকাতা হইতে একটা লোক আসিয়াছিল। সে কেষ্টার বাপ, গ্রামের চৌকিদার, শিশি-বোতল-ক্রেতা, মেনী, ভিলে ও অন্যান্য গ্রামবাসীরে সঙ্গে করিয়া আমার বাটীতে আসিয়া উপস্থিত হইল। কলিকাতার সেই লোকটা বলিল,—“আমি যোগেশ বাবুর সরকার। আমার বাবুর বাড়ীতে এই বালিকার মাসী চাকরানী ছিল। যোগেশ বাবুর স্ত্রী ঘোরতর পীড়িত হইয়াছিলেন। ইহার মাসি তাঁহার অনেক সেবা করিয়াছিল। যোগেশ বাবুর স্ত্রীর কাণে দুইটী হীরার টপ ছিল। কিছু দিন পূর্ব্বে একটা টপ হারাইয়া গিয়াছিল। ভালরূপ ছোড়া মিলাইতে না পারিয়া অপর টপটী তাঁহার বাসকতে তিনি ফেলিয়া রাখিয়াছিলেন। পুরস্কার স্বরূপ ইহার মাসীকে তিনি সেই টপটী দিয়াছিলেন। তাহার সোণাটুকু ইহার মাসী বোধ হয় বেচিয়া ফেলিয়াছিল। কাচ মনে করিয়া হীরকখণ্ড শিশির ভিতর ফেলিয়া রাখিয়াছিল। তাহার মূল্য চারি শত টাকা। আপনি দুই পয়সায় তাহা ফাকি দিয়া লইয়াছেন। যে টপটী হারাইয়া গিয়াছিল, এক্ষণে তাহা মিলিয়াছে। সে জন্য জোড়া মিলাইবার নিমিত্ত এই বালিকা ও তাহার ভ্রাতাকে চারিশত টাকা দিয়া হীরক খণ্ড লইতে বাবু আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন। হীরক খণ্ড আপনি আমাকে প্রদান করুন।”
পয়সা দিয়া কিনিয়াছি, কেন আমি দিব, এইরূপ বলিয়া প্রথম আমি দিতে সম্মত হই নাই। কিন্তু পরে বুঝিলাম যে, যোগেশ বাবু আমাকে সহজে ছাড়িবেন না। চিরকাল মামলা মকদ্দমা করিয়া আসিতেছি। মামলা মকদ্দমা আমি বিলক্ষণ জানি। আমি বুঝিলাম যে, মকদ্দমা হইলে হীরা আমি রাখিতে পারিব না, চাই কি আমার সাজা হইলেও হইতে পারে। ফল কথা, হীরা আমাকে ফিরিয়া দিতে হইল। যোগেশ বাবু হীরার মূল্য চারি শত টাকা মেনী ও ভিলের নামে এক স্থানে জমা রাখিয়াছেন। এক্ষণে প্রতি মাসে তিনি তাহাদিগকে পাঁচ টাকা করিয়া দিতেছেন।
হীরকও গেল, বাগানের খোঁচটী ও ভাঙ্গিল না। মনে আমার ঘোরতর দুঃখ হইল। মা দুর্গাকে ভর্ৎসনা করিয়া আমি বলিতে লাগিলাম,— “মা! কেন আমার এরূপ হরিষে বিষাদ করিলে? চারি শত টাকা আমার হাতে দিয়া কেন আবার কাড়িয়া লইলে? এবার হইতে আর মা তোমার আমি পূজা করিব না।”
পূজা করিব না শুনিয়া মা দুর্গার বোধ হয় রাগ হইল। আমাকে আক্রমণ করিবার নিমিত্ত পর দিন তিনি জ্বরাসুরকে প্রেরণ করিলেন। কম্প-দিয়া আমার জ্বর আসিল। একদিন গেল, দুই দিন গেল, জ্বর ক্রমেই বাড়িতে লাগিল। তিন দিনের দিন আমি বেচু ভুঞাকে ডাকিতে পাঠাইলাম। বেচু জাতিতে কৈবর্ত্ত। প্রথম সে চাষ করিত, এখন কবিরাজ হইয়াছে। চারি পাঁচ খানা গ্রামে বেচুর বিলক্ষণ পসার হইয়াছে। আমার হাত দেখিয়া বেচু শ্লোক পড়িয়া বলিল, —
“কম্প দিয়া জ্বর আসে কম্প দেয় নাড়ী।
ধড় ফড় ক’রে রোগী যায় যম-বাড়ী॥
ইহাকে বিষ-বড়ি দিতে হইবে।”
এলোকেশী নিকটে ছিলেন। তিনি বলিলেন, “সে কি! তিন দিনের জ্বরে বিষ-বড়ি?”
বেচু বলিল,—“এ সামান্য বিষ-বড়ি নয়। এ নূতন ঔষধ সম্প্রতি আমি নিজে মনগড়া করিয়া প্রস্তুত করিয়াছি। ইহাতে কোন দোষ নাই। ইহার গুণ অনেক। এই দেখ আমি নিজে আস্ত দুইটা খাইয়া ফেলি।” এই কথা বলিয়া বেচু নিজে দুইটা বড়ি গিলিয়া ফেলিল। তাহার পর মধুর সহিত খলে মাড়িয়া আমাকে কটা বড়ি খাইতে দিল।
বেচু চলিয়া গেল। তিন ঘণ্টা পরে তাহার ঔষধের গুণ প্রকাশিত হইল। আমার চক্ষু দুইটী লাল হইয়া উঠিল। বুক ধড় ফড় করিতে লাগিল। শরীর অবসন্ন হইয়া আসিল। প্রাণ যায় আর কি। এলোকেশীর মেজাজটা কড়া বটে, কিন্তু শরীরে অনেক গুণ আছে। মাটিতে পড়িয়া তিনি কাঁদিতে লাগিলেন।
ডমরুধরের বন্ধু অধিকড়ি বলিলেন, “হাঁ, সেই সময় আমি তোমার বাড়ীতে আসিয়াছিলাম। তোমার সেই অবস্থা দেখিয়া তাড়াতাড়ি আমি বেচু ভুঞাকে ডাকিতে যাইলাম। বেচু ঘরে ছিল না। খুঁজিতে খুঁজিতে দেখিলাম যে, সে এক পানা-পুকুরের জলে গা ডুবাইয়া বসিয়া আছে! তাহার চক্ষু দুইটী জবা ফুলের ন্যায় হইয়াছে। পানা পুকুরের পচা পাক তুলিয়া মাথায় দিতেছে। আমি বলিলাম, —‘বেচু! করিয়াছ কি? ডমরুধরকে তুমি কি ঔষধ দিয়াছ? তোমার ঔষধ খাইয়া ডমরুধর মারা পড়িতে বসিয়াছে!’ মাথায় কাদা দিতে দিতে বাজখাঁই ‘স্বরে বেচু উত্তর করিল,—‘বড়ি খাইয়া আমিই বা কোন ভাল আছি।’ আমি বুঝিলাম যে, সে অবস্থায় তাহাকে আর কোন কথা বলা বৃথা। পুনরায় তোমার বাটীতে আসিয়া মাথায় অনেক জল দিয়া সে যাত্রা তোমার প্রাণ আমরা রক্ষা করিলাম।”
ডমরুধর বলিলেন,—বেচুর ঔষধ হইতে প্রাণ রক্ষা হইল বটে, কিন্তু জ্বর আমার গেল না। পীড়া কঠিন হইয়া উঠল। তোমরা সকলেই আমাকে দেখিতে আসিতে। তোমরা সকলেই মনে করিরাছিলে যে, সে যাত্রা আমি আর রক্ষা পাইব না। একদিন রাঘব ও নকুল ভট্টাচার্য মহাশয় আমাকে দেখিতে আসিয়াছিলেন। বিছানার দুই পার্শ্বে দুই জনে বসিয়া আমাকে অনেক আশ্বাস ও ভরসা দিতে লাগিলেন।
রাঘব বলিলেন,—“দেখুন, ভট্টাচার্য্য মহাশয়, অঙ্গদ মজুমদারকে আপনি জানিতেন? তাহার শরীরটী ঠিক ডমরুধরের মত ছিল। এইরূপ কাটি কাটি হাত, এইরূপ কাটি কাটি পা, শরীরে চর্ব্বি একটুও ছিল না। তাহার পীড়াটিও ঠিক এইরূপ হইয়াছিল। চিতার উপর তাহাকে শোয়াইয়া যখন আমরা আগুন দিলাম, তখন সেই আগুনের তাতে তাহার শরীরটী শটকে উঠিল। ধনুকের মত হইয়া তাহার মাজাটা চিতার উপর উঠিয়া পড়িল। কাঠ সব পুড়িয়া গেল, কিন্তু অঙ্গ পুড়িল না।
তাহাকে আমরা জলে ফেলিয়া দিলাম। কিন্তু আমরা স্নান করিয়া উঠিতে না উঠিতে, পাচ ছয়টা কুকুর ও শৃগাল আসিয়া জলে ঝাঁপাঝাঁপি করিয়া তাহাকে খাইয়া ফেলিল। ডমরুবাবু, তোমার শরীরটীও ঠিক সেইরূপ। কিন্তু তোমার ভয় নাই। আমরা অধিক কাঠ দিয়া দেখিব। তবে নিতান্তই যদি তুমি পুড়িয়া না যাও, তাহা হইলে কাজেই তোমাকে আধপোড়া করিয়া ফেলিয়া দিতে হইবে।”
নকুল ভট্টাচার্য্য আমাকে বলিলেন,—“তোমার পুরোহিতের বাড়ী এ স্থান হইতে দুই ক্রোশ। মন্ত্র পড়াইতে রাত্রিতে যদি আমাকে ঘাটে যাইতে হয়, তাহা হইলে শ্রাদ্ধ আমাকে দিয়া করাইতে হইবে। নিজের পুরোহিতকে দিয়া করাইতে পারিবে না। তুমি সে কথা বাড়ীতে বলিয়া রাখ। মৃত্যু হইয়া গেলে আর কথা বলিতে পারিবে না, —
“মনে কর শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর।
অন্যে বাক্য কবে কিন্তু তুমি রবে নিরুত্তর।”
এলোকেশী পাশের ঘরে বসিয়া এই সব কথা শুনিতেছিলেন। সহসা খেঙরা হস্তে উগ্রচণ্ডার ন্যায় রণমূর্ত্তিতে আলিয়া সপ্ করিয়া এক ঘা নকুলের পিঠে বসাইয়া দিলেন। তাহার পর আর এক ঘা রাঘবের মাথায়। ঘর হইতে দুইজনে পলাইলেন। এলোকেশী তাঁহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গিয়া আরও দুই চারি ঘা বসাইয়া দিলেন।