ধাঙ্গড়ের ঘরে কন্দর্প পুরুষ
প্রায় দুই ঘণ্ট। পরে ঔষধের ক্রিয়া আরম্ভ হইল। প্রথম ব্যাঘ্রের পেট কামড়াইতে লাগিল। পেটের কামড়ে ব্যাঘ্র অস্থির হইয়া ছটফট করিতে লাগিল। মাটিতে পড়িয়া গড়াগড়ি দিতে লাগিল। বৃদ্ধ হইলে কি হয়, পেটের কামড়ে সহস্র যুবা ব্যাঘ্রের বলে সে এখন লম্ফ ঝম্ফ করিতে লাগিল। ব্যথা যখন কিছুতেই নিবৃত্ত হইল না, তখন যে দিকে তাহার দুই চক্ষু গেল, সেই দিকে ঘোড় দৌড়ের অশ্ববেগে সে ছুটিয়া চলিল। ছোট ছোট গাং লাফ দিয়া ও বড় বড় গাং সাঁতার দিয়া পার হইতে লাগিল। ক্রমাগত দৌড়িতে লাগিল। হাঁ করিয়া দৌড়িতেছিল, সে জন্য পেটের ভিতর বসিয়া আমি কতক কতক দেখিতে পাইতেছিলাম। বন পার হইল, নদী নালা খাল বিল অনেক পার হইয়া গেল। পেটের কামড়ে সমস্ত রাত্রি দৌড়িল, সমস্ত দিন দৌড়িল, পুনরায় আর এক রাত্রি দৌড়িল। সুন্দরবনের এলাকা পার হইয়া গ্রামসমূহের নিকট মাঠ দিয়া ধাবিত হইল। অবশেষে দ্বিতীয় দিনের বেলা তিনটার সময় বমন করিতে আরম্ভ করিল। শৈশব কালে মাংসপ্রাশনের সময় হইতে যত মহিষ হরিণ শূকর প্রভৃতি খাইয়াছিল, তাহাদের হাড়গোড় সমুদয় বমন করিয়া ফেলিল। উদ্গারের সহিত আমাকে সে বাহির করিয়া ফেলিল।
কিঞ্চিৎ সুস্থ হইয়া আমার দিকে সে দুই একবার কটমট করিয়া চাহিল। মনে মনে ভাবিল, – “এ লোকটাকে গিলিয়া ভাল কুকর্ম্ম করিয়া- ছিলাম। যেমন রূপ তেমনি গুণ, না আছে রস না আছে কষ! কাল চামড়া মোড়া কেবল খান কতক হাড়। এর চেয়ে যদি দশ মণ পাথুরে কয়লা গিলিতাম, তাহা হইলে কাজ হইত।”
এই প্রকার চিন্তা করিয়া ব্যাঘ্র দ্রুতবেগে সে স্থান হইতে প্রস্থান করিল। পশু! সে আমার রূপের মহিমা কি বুঝিবে?
লম্বোদর বলিলেন,—তা সব হইল। কিন্তু একটা কথা তোমাকে আমি জিজ্ঞাসা করি। ব্যাঘ্রের পেটের ভিতর হইতে তোমার কর্মচারীর নিকট সে চিঠি তুমি কি করিয়া পাঠাইলে?
কিয়ৎক্ষণের নিমিত্ত নীরব থাকিয়া ডমরুধর উত্তর করিলেন,— “দেখ লম্বোদর! সকল কথার খোঁচ ধরিও না। এই মাত্র তোমাকে আমি বলিতে পারি যে, বাঘের পেটের ভিতর ডাকঘর নাই, সে স্থানে টীকিট বিক্রয় হয় না, সে স্থানে মনিঅর্ডার হয় না। তিরিক্ষি মেজাজ ডাক- বাবু সেখানে বসিয়া নাই।’ পত্র প্রেরণের সমস্যা এইরূপে হেলায় মীমাংসা করিয়া ডমরুধর পুনরায় বলিতে লাগিলেন,—
বাঘের পেটে কয়দিন আমার উদরে অন্ন জল যায় নাই। আমি অতিশয় দুর্ব্বল হইয়াছিলাম। ব্যাঘ্র চলিয়া গেলে কিছুক্ষণের নিমিত্ত সেই স্থানে নির্জীব হইয়া পড়িয়া রহিলাম। তাহার পর আস্তে আস্তে উঠিয়া এদিক্ ওদিক্ চাহিয়া দেখিলাম। নিকটে একখানি গ্রাম দেখিয়া তাহার ভিতর প্রবেশ করিলাম। গ্রামখানি ছোট, কেবল ইতর লোকের বাস। গ্রামবাসীদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া অবগত হইলাম যে, সে স্থান হইতে আমার আবাদ অনেক দূর, কেহ তাহার নামও জানে না। বরং আমার গ্রাম নিকট, সাত আট ক্রোশ মাত্র। তপস্যা করিতে যখন আমি বনে গমন করি, তখন টাকা কড়ি সঙ্গে লইয়া যাই নাই। সে নিমিত্ত নৌকা অথবা শালতি ভাড়া করিতে পারিলাম না। পদ-ব্রজেই আমার গ্রাম অভিমুখে আমি চলিলাম।
আকাশভ্রমণে, অনাহারে, নানারূপ ভাবনা চিন্তায়, আমার পা আর উঠে না। তাহার পর বর্ষার শেষ। নদী নালা জলে ও মাঠ ঘাট কাদা কিচায় পরিপূর্ণ। বড়ই কষ্ট হইতে লাগিল। যাইতে যাইতে এক মাঠের মাঝখানে সন্ধ্যা হইয়া গেল। এখন কোথায় যাই। আর একটু আগে গিয়া মাঠের মাঝখানে নারিকেল পাতায় আচ্ছাদিত সামান্য এক- ধানি চালা দেখিতে পাইলাম। সেই স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলাম। জনমানবকে সে চালায় দেখিতে পাইলাম না। প্রাঙ্গণে শসা গাছের এক মাচা ছিল। অনেকগুলি দুধে শসা তাহা হইতে ঝুলিতেছিল। পেট ভরিয়া আমি সেই শসার আঁতি খাইলাম। কিঞ্চিৎ সুস্থ হইয়া আমি চালার ভিতর প্রবেশ করিলাম। গোটাকতক মেটে হাঁড়ী ভিন্ন তাহার ভিতর আর কিছু দেখিতে পাইলাম না। চালার এক পার্শ্বে ছেঁচা বাঁশ দিয়া গঠিত একটা তক্তপোষের মত ছিল। তাহার উপর একটা ছেঁড়া মাদুর ও একটা ময়লা চিরকুট বালিশ ছিল। ঘোর ক্লান্তিতে কাতর হইয়া আমি তাহার উপর শুইয়া পড়িলাম।
সন্ধ্যা হইল। অন্ধকার হইল। সেই সময় কে একজন চালার ভিতর প্রবেশ করিল। দিয়াসলাই জ্বালাইয়া একটা কেরোসিনের ডিবে প্রজ্বলিত করিল। তখন আমি দেখিলাম যে, সে একটা কালো স্ত্রীলোক। তাহার হাতে শাঁখা আছে, পায়ে প্রায় পাঁচসের ওজনের কাসার বাঁকমল আছে। মাঝে মাঝে এ অঞ্চলে অনেক ধাঙ্গড় মজুরি করিতে আসে। আমি বুঝিলাম যে, স্ত্রীলোকটা ধাঙ্গড়ানী। প্রথম আমি একটু গলার সাড়া দিলাম। সে আমার দিকে চাহিয়া দেখিল। তাহার পর আমি উঠিয়া বসিলাম। তাহাকে বলিলাম যে,—বাঘের মুখ হইতে আমি অতি কষ্টে বাঁচিয়া সে স্থানে আসিয়াছি। আর পথ চলিতে পারি না। রাত্রি যাপনের নিমিত্ত তাহারা যদি একটু স্থান প্রদান করে, তাহা হইলে আমার বড় উপকার হয়।
সাধে কি এলোকেশীর মনে সর্ব্বদা আমার প্রতি সন্দেহ! আমার গায়ের বর্ণটী কৃষ্ণঠাকুরের চেয়ে কালো। শরীরের ভিতর কেবল খান কতক হাড়। বাঘ মিথ্যা কথা বলে নাই— মাথার মাঝখানে কিন্তু এমন টাকের চারিদিকে পাকা চুল, চকচকে টাক কার আছে? প্রকাণ্ড টাক। মুখের দুই পাশে সাদা ফেকো। দাঁত একটীও নাই। তথাপি আমার কিরূপ একটা শ্রী ছাঁদ আছে, কিরূপ একটা লাবণ্য আছে যে, তাতে রাহুরও ভুল হয়। আর মাগীগুলোও আমার আর মাগীগুলোও আমার গায়ে যেন ঢলিয়া পড়ে। অবাক হইয়া ধাঙ্গড় মাগী আমার টাক পানে চায়, আর মুচকে মুচকে হাসে। শেষে সে কেবল দুইটা কথা বলিল,—“মাঝি আসুক!” তোমাদের যেমন ‘বাবু’, ইহাদের সেইরূপ সম্মানসূচক উপাধি “মাঝি!”
কিছুক্ষণ পরে একটা হোঁৎকা মিনসে চালার ভিতর প্রবেশ করিল। তোমরা আমাকে কালো বল, কিন্তু তার রঙ্গের তুলনায় আমি তো ফিট গৌরবর্ণ। সে আসিয়া যেই আমার দিকে দৃষ্টিপাত করিল, আর বাম হাতে আমার মাথা নোওয়াইয়া দক্ষিণ হাতে আমার পিঠে বজ্রসম দুইটা কিল বসাইয়া দিল। গন্ধ পাইয়া আমি বুঝিলাম যে, ধাঙ্গড় মদ খাইয়াছিল।
তাহার পর বলিল,—“এতদিন পরে বেটাকে আজ ধরিয়াছি। ফাঁক পাইলেই আসে যায়, ধরিতে আর পারি না। আজ বেটাকে ধরিয়াছি, ইয়ারকি দিতে জায়গা পাও না, আমার ঘরে ইয়ারকি! হাড় গুড়ো করিয়া ঐখানে আজ পুতিব!”
এই কথা বলিয়া সে পুনরায় আর দুইটা কিল মারিল।
আমি বলিলাম,—“আমি বিদেশী লোক। তোমার ঘরে আমি কখন আসি নাই; আজ বিপদে পড়িয়া এ স্থানে আসিয়াছি।”
ধাঙ্গড় বলিল,—বিদেশী লোক! গ্রীষ্মকালে মোড়লদের পুকুরে ফেটীজালে কে মাছ ধরিতেছিল? মাঝিনীকে কে এক রাশি চুণো মাছ দিয়াছিল? কেন দিয়াছিলি, তা কি আমি বুঝিতে পারি নাই?
এই কথা বলিয়া আবার দুইটা কিল মারিল।
আমি বলিলাম, আমি কখন ফেটিজালে মাছ ধরি নাই। আমি ভদ্রলোক। মিছামিছি বিনা দোষে আমাকে মার কেন?
ধাঙ্গড় বলিল,—‘ভদ্রলোক! ভদ্রলোকের ঐরকম টাক হয়! ভদ্রলোকের ঐরকম কিম্ভুত কিমাকার চেহারা হয়! আর মাঝিনীর পসন্দ; আমাকে পসন্দ হয় না, তোকে পসন্দ!’
এই কথা বলিয়া সে পুনরায় আর দুইটা কিল মারিল।
আমি দেখিলাম যে, কথা কহিলেই দুইটা করিয়া কিল খাইতে হয়। তাহার পর, দারুণ প্রহার বরং সহ্য হয়, কিন্তু সে যে আমাকে কুৎসিত বলিল, সে কথা আমার প্রাণে সহ্য হইল না। আমি চুপ করিয়া রহিলাম।
কিন্তু নীরব থাকিয়াও নিস্তার পাইলাম না। সে আমাকে উত্তম মধ্যম অধম বিলক্ষণ প্রহার করিল; তাহার পর আমার কাপড় চোপড় কাড়িয়া লইয়া উলঙ্গ করিয়া গলা টিপিয়া সে স্থান হইতে বাহির করিয়া দিল। কেবল মাত্র প্রাণে সে আমাকে মারিল না। আমি উঠিতে পড়িতে উঠিতে পড়িতে মাঠের আল দিয়া চলিলাম। অতি ক্লেশে বহুদূর একখানি গ্রামের নিকট গিয়া উপস্থিত হইলাম। এক তো রাত্রি হইয়াছে, তাহার পর উলঙ্গ, এ অবস্থায় সে গ্রামের ভিতর প্রবেশ করিলাম না। মনে করিলাম যে, প্রাতঃকালে কাহারও নিকট হইতে একখানি ছেঁড়াখোঁড়া গামছা চাহিয়া লইব। সেইখানি পরিয়া আপনার গ্রামে যাইব। নিকটে একটা বাগান দেখিতে পাইলাম। নারিকেল গাছ বেষ্টিত শান বাঁধা ঘাটবিশিষ্ট তাহার ভিতর একটা পুষ্করিণী ছিল। দারুণ প্রহারে শরীরে আমার বিষম বেদনা হইয়াছিল। ঘাটের চাতালে আমি শয়ন করিলাম। ঘোর ক্লেশে নিদারুণ প্রহারে শরীরে আর আমার কিছু ছল না। অল্পক্ষণ পরেই আমি নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িলাম। কখন রাত্রি অবসান হইয়াছিল, তাহা আমি জানিতে পারি নাই। সহসা “ভূত! ভূত!” চীৎকার শুনিয়া আমার নিদ্রা ভঙ্গ হইল। আমি চাহিয়া দেখিলাম যে, প্রাতঃকাল হইয়াছে; সূর্য্য উদয় হইয়াছে। অন্যদিকে চাহিয়া দেখিলাম যে, জন কয়েক স্ত্রীলোক সেই পুষ্করিণীতে জল লইতে আসিয়াছিল। সেই উলঙ্গ অবস্থায় আমাকে দেখিয়া “ভূত! ভূত!” বলিয়া চীৎকার করিতে করিতে পলায়ন করিতেছে। তাহাদের কোমর হইতে কলসী পড়িয়া ভাঙ্গিয়া গেল। কিছু দূরে মাঠ হইতে কয়েক জন পুরুষ মানুষ “কি হইয়াছে, কি হইয়াছে” বলিয়া দৌড়িয়া আসিল।