ডমরু-চরিত · ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

Chapter 25: চতুর্থ গল্প — দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

ডমরুধরের সিদ্ধিলাভ।

এইরূপ কত যে বিভীষিকা হইল, সে কথা তোমাদিগকে কি আর বলিব! অবশেষে আমার পরলোকগতা মাতা আসিলেন। তিনি বলিলেন,— “বাছা, ডমরুধর! অনেক তপ করিয়াছ, আর কাজ নাই, এখন ঘরে চল, এখানে বসিয়া থাকিলে অসুস্থ করিবে!” আমি কোন উত্তর করিলাম না।

তাহার পর আমার স্ত্রী এলোকেশী আসিলেন। তিনি বলিলেন,— “ঘরে চল্! না গেলে এখনি কাণ ধরিয়া লইয়া যাইব।” তোমরা সকলেই জান যে, এলোকেশীকে আমি যমের মত ভয় করি। তাঁহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া প্রথম আমার হৃৎকম্প হইয়াছিল। কিন্তু আমার স্মরণ হইল যে, এ সব মিথ্যা। তখন আমি পুনরায় ধ্যানে প্রবৃত্ত হইলাম।

আমার সে কঠোর তপ যখন কেহ কিছুতেই ভঙ্গ করিতে পারিল না, তখন মা দুর্গা স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত হইলেন। মা বলিলেন,—“ডমরুধর! তোমার কঠোর তপস্থায় আমি সন্তোষ লাভ করিয়াছি। এক্ষণে বর প্রার্থনা কর।”

আমি চক্ষু চাহিয়া দেখিলাম যে, ঠিক যেমন এই প্রতিমা, দেবী সেই বেশে আমার নিকট আগমন করিয়াছেন। মা দশভূজা, দক্ষিণে গণেশ ও লক্ষ্মী, বামে সরস্বতী ও কার্ত্তিক, নিম্নে সিংহ ও অসুর।

মায়ের সেই উজ্জ্বল রূপ দেখিয়া আমি হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলাম। চারি দিক্ আঁধার দেখিতে লাগিলাম। মনের উপরও যেন ছানি পড়িয়া গেল। কি বর চাহিব তাহা খুঁজিয়া পাইলাম না। আমার দুরদৃষ্ট! তা না হইলে কাছে লক্ষ্মী ছিলেন। যদি ধন চাহিতাম, এত ধন তিনি দিতেন যে, রাখিতে, ঘরে স্থান হইত না। কাছে সরস্বতী ছিলেন, যদি বিদ্যা চাহিতাম, তাহা হইলে আমিও একটা বি-এ, এম-এ, পাস করা ফোচকে ছোড়া হইতে পারিতাম।

কিন্তু সে জ্ঞান আমার হইল না। কার্তিকের ময়ুরটী দেখিয়া আকাশ ভ্রমণের সাধ আমার মনে উদয় হইল। আমি বলিলাম, – “যদি বর দিবেই, তবে কার্তিকের ময়ূরটী আমাকে প্রদান কর। উহার পিঠে চড়িয়া আমি আকাশ ভ্রমণ করিব।”

দেবী বলিলেন,–“ছি বাছা, ও কথা বলিও না। কার্ত্তিক ছেলে মানুষ। তাহার ময়ূরটি দিলে সে কাঁদিবে।”

আমি উত্তর করিলাম, – “অন্য বর চাই না মা! নিদেন সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত একদিনের জন্য ময়ূরটীকে দাও, মা! তাহার পিঠে চড়িয়া সমস্ত দিন আকাশ ভ্রমণ করিয়া সন্ধ্যা বেলা তোমাদের ময়ূর তোমাদিগকে ফিরাইয়া দিব। যদি না দাও, তবে পুনরায় আমি এই তপে বসিলাম। “

দেবীর ভয় হইল। তিনি বলিলেন,– “না বাছা! আর তপস্যা করিও না। তোমার তপে পৃথিবী তাপিত হইয়াছে। আর তপ করিলে মহা- প্রলয়ের অনল উত্থিত হইয়া সমস্ত জগৎ ভস্ম হইয়া যাইবে।”

এই কথা বলিয়া কার্তিকের সহিত দেবী চুপি চুপি কি পরামর্শ করিলেন। তাহার পর তিনি বলিলেন, – “আচ্ছা বাছা, এক দিনের জন্য কার্ত্তিক তোমাকে ময়ূরটী প্রদান করিবে। আমার সিংহের একটা বাচ্ছা দিয়া কার্ত্তিককে আমি ভুলাইয়া রাখিব। কিন্তু ডমরুধর! সন্ধ্যা হইলেই ময়ূরকে তুমি ছাড়িয়া দিবে। না ছাড়িয়া দিলে, সে তোমাকে লবণ ইক্ষুরস, সুরা, ঘৃত, ক্ষীর, দধি সমুদ্র পারে স্বাদু সমুদ্রে লইয়া ফেলিবে। সে সমুদ্রে তুমি হাবুডুবু খাইয়া মরিবে।”

এইরূপ সাবধান করিয়া দেবী আমাকে ময়ূরটী প্রদান করিলেন। কার্ত্তিককে সিংহশাবক দিলেন। সিংহের বাচ্ছাটী কোলে লইয়া কার্ত্তিক কৈলাসে গমন করিলেন। প্রতিমায় যেরূপ গঠিত হয়, কার্ত্তিকের ময়ূর প্রকৃত সেরূপ নহে। সে ময়ূর কিরূপ, খড়ি দিয়া এই শানের উপর আমি তোমাদিগকে আঁকিয়া দেখাই।

কৈলাসি ময়ূর।

ময়ূরের ছবি দেখিতে সকলে তাহার উপর ঝুঁকিয়া পড়িলেন। ছবি দেখিয়া লম্বোদর একটু হাসিলেন,—কুপিত হইয়া ডমরুধর বলিলেন,— “হাসিও না। এ তোমাদের পৃথিবীর ক্যাক্-কেঁকে প্যাকম-ধরা ময়ূর নহে। এ আসল কার্ত্তিকের কৈলাসি ময়ূর।”

তাহার পর ডমরুধর পুনরায় গল্প আরম্ভ করিলেন—গণেশ, লক্ষ্মী, দুর্গা ও সরস্বতীকে প্রণাম করিয়া আমি ময়ূরের পিঠে চড়িয়া বসিলাম। তাহাকে আকাশের দিকে চালাইতে চেষ্টা করিলাম। ময়ূর উপরে উঠিল না। তখন দেবী হাসিয়া বলিলেন,— মন্ত্র না পড়িলে নরলোককে লইয়া ময়ূর উপরে উঠিবে না। শূন্যে আরোহণ করিবার সময় তুমি এই মন্ত্রটী পাঠ করিবে,—

‘জয় কৈলাসবাসিনী মহেশগৃহিণী গণেশজননী।’

তাহার পর সন্ধ্যা বেলা তোমার বাসার উপরে আসিয়া এই মন্ত্রটী বলিবে,

‘জয় কৈলাসবাসিনী ত্র্যম্বকগৃহিণী ষড়াননজননী।’

দ্বিতীয় মন্ত্রটী অতি সাবধানে স্মরণ করিয়া রাখিবে। বাসার উপর আসিয়া এই মন্ত্র পাঠ না করিলে ময়ূর তোমাকে সপ্ত দ্বীপ সাত সমুদ্র তের নদী পারে লোকালোক পর্ব্বতের ওধারে সূর্য্যের অগম্য তিমিরপূর্ণ গভীর গহ্বরে ফেলিয়া চলিয়া যাইবে।

আমি বলিলাম,—“মন্ত্রটী অতি সহজ। কেন মনে করিয়া রাখিতে পারিব না? তবে দ্বিতীয় মন্ত্রে ঐ গুম্বজগৃহিণী কথাটা কিছু কঠিন।”

দেবী হাসিয়া বলিলেন,—“গুম্বজগৃহিণী নহে, ত্র্যম্বকগৃহিণী।”

আমি বলিলাম,—“এইবার আমি ভাল করিয়া স্মরণ রাখিব, গুম্বজ নহে ত্র্যম্বক।”

দেখ লম্বোদর, এইস্থানে তোমাদের একটা কথা আমি বলিয়া রাখি। প্রতিমায় এই যে কার্তিক সকলে করে, এ এ-কেলে কার্তিক নহে, এ সে-কেলে কার্ত্তিক। লম্বা কোঁচা গুঁফো ধেড়ে কার্তিক কি বাপু! এই কি তোমাদের ভক্তি! ছি! এখনকার কার্ত্তিক ছেলে-মানুষ। মোজা ইজের কোট টুপি পরা সিংহশাবক কোলে কার্ত্তিক আমি এইরূপ দেখিয়াছিলাম। প্রতিমায়ও তাই করিয়াছি। প্রতিমা সহিত দেবী অন্তর্ধান হইলেন। আমি প্রথম, মন্ত্রটী পাঠ করিলাম,

‘জয় কৈলাসবাসিনী মহেশগৃহিণী গণেশজননী।’


এ-কেলে কার্ত্তিক