ডমরু-চরিত · ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

Chapter 19: তৃতীয় গল্প — চতুর্থ পরিচ্ছেদ

কার্ত্তিকের কাঁধে বাঘ।

ডমরুধর বলিতে লাগিলেন,—দুইটা আমির উপদ্রবে আমি জ্বালাতন হইলাম। দিনকতক সুন্দরবনে আমার আবাদে গিয়া বাস করি, এইরূপ মনন করিয়া আমি সুন্দরবনে আবাদে গমন করিলাম। এই সময় সেই স্থানে এক বাঘের উপদ্রব হইয়াছিল। গরু বাছুর মানুষ খাইয়া সকলকে বড় জ্বালাতন করিয়াছিল। মন্ত্রবলে বাঘের মুখ বন্ধ করিবার নিমিত্ত একদিন বৈকাল বেলা আমি এক ফকিরের নিকট গমন করিতেছিলাম। পথে নানা স্থানে শুষ্ক ঘাস ও বৃক্ষপত্র পড়িয়াছিল। এক স্থানে শুল্ক পত্রের ভিতর ছিদ্রের ন্যায় কি একটা দেখিতে পাইলাম। নিকটে যাইবামাত্র হুস করিয়া আমি এক গভীর গর্ত্তের ভিতর পড়িয়া যাইলাম। সর্ব্বনাশ! দেখি না, সেই গর্ত্তের ভিতর প্রকাণ্ড এক কেঁদো বাঘ রহিয়াছে। মহূর্ত্ত মধ্যে সকল কথা আমি বুঝিতে পারিলাম। বাঘ ধরিবার নিমিত্ত ধাঙ্গড় রেওতগণ গভীর গর্ত্ত করিয়া তাহার উপর পাতা নাতা চাপা দিয়া রাখিয়াছিল। বাঘ সেই গর্ভে পড়িয়া গিয়াছিল। আর উঠিতে পারিতেছিল না। আমিও সেই গর্ত্তে পড়িয়া যাইলাম।

গর্ত্তে পড়িয়া ব্যাঘ্রের বিকট বদন দর্শন করিয়া আমার আত্মা পুরুষ শুকাইয়া গেল। আমি মনে করিলাম যে, ক্ষুধার্ত্ত বাঘ এইবার আমাকে ছিঁড়িয়া খাইবে। প্রাণ ভরিয়া আমি মাকে ডাকিতে লাগিলাম। করাতি কলে ইঁদুর পড়িলে যেরূপ ছট্‌ফট্ করে, প্রাণভয়ে গর্ত্তের ভিতর আমি সেইরূপ ছট্‌ফট্ করিতে লাগিলাম। বলিব কি ভাই, আমার উপর মা দুর্গার কৃপা! এক আশ্চর্য্য উপায়ে তিনি আমাকে রক্ষা করিলেন। আমি যেরূপ ফাঁদে পড়িয়াছিলাম, ব্যাঘ্রও সেইরূপ ফাঁদে পড়িয়াছিল। ফাঁদে পড়িয়া আমার যেরূপ ভয় হইয়াছিল, তাহারও সেইরূপ ভয় হইয়াছিল। আমাকে ভক্ষণ না করিয়া, এক লম্ফ দিয়া সে আমার কাঁধের উপর উঠিল। আমার কাঁধে চড়িয়া যখন সে কতকটা উচ্চ হইল, তখন আর এক লাফে সে গর্ত্তের উপর গিয়া উঠিল। তাহার পর বনে পলায়ন করিল।

সন্ধ্যার পর ধাঙ্গড়েরা আসিয়া গর্ত্তের ভিতর হইতে আমাকে উঠাইল। তাহাদের সঙ্গে আমি বাসায় গমন করিলাম। আমি তখনও বাহিরে, কিন্তু দূর হইতে দেখিলাম যে, আর একটা ‘আমি’ বাসার ভিতর গট হইয়া বসিয়া আছি। আবার বাহিরে একটা আমি, ভিতরে একটা আমি। আবার ‘ঘরে গৌতম বাহিরে গৌতম।’

বনবাসী হইয়াও আমি সে উৎপাত হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারিলাম না। তবে আর এ স্থানে থাকিয়া কি হইবে? তাহা ছাড়া আর একটা ‘আমি’ সহসা যদি এই বনে আসিতে পারে, তাহা হইলে সে আমার গৃহেও থাকিতে পারে। সেস্থানে সে ‘আমিটা’ কি করিতেছি না করিতেছি, তাহার ঠিক কি? সেজন্য বাড়ী ফিরিয়া যাইতে আমি মানস করিলাম।

সুন্দরবন হইতে আমাদের বাড়ী আসিতে হইলে অনেক দূর নৌকায় আসিতে হয়, তাহার পর সাল্তি। গ্রীষ্মকালে যে স্থানে সাল্তি লাগে, সে স্থান হইতে আমাদের গ্রাম পাঁচ ক্রোশ। সন্ধ্যার সময় সেই স্থানে আসিয়া আমার সালতি লাগিল। বাকী পাঁচ ক্রোশ পথ আমি হাঁটিয়া চলিলাম। ভেড়িতে এক জনেরা মাছ ধরিতেছিল। তাহাদের নিকট হইতে একটা ভেটকী মাছ চাহিয়া লইলাম।