তবুও নীলাম্বর ভাবিতেছিল—এ কথা বিরাজ মুখে আনিল কি করিয়া। সে তাহাকে মার-ধোর করিতে পারে, তাহার সম্বন্ধে এতবড় হীন ধারণা জন্মিল কেন? একে ত সংসারে দুঃখকষ্টের অবধি নাই, তাহার উপর প্রতিদিন এ কি হইতে লাগিল? দুদিন যায় না, বিবাদ বাধে। চোখে চোখে কলহ, পদে পদে মতভেদ হয়। সর্ব্বোপরি তাহার এমন বিরাজ দিন দিন এমন হইয়া যাইতে লাগিল, অথচ কোন দিকে চাহিয়া সে এই দুঃখের সাগরের কিনারা দেখিল না। ভগবানের চরণে নীলাম্বরের অচলা ভক্তি ছিল, অদৃষ্টের লেখায় অসীম বিশ্বাস ছিল, সে সেই কথাই ভাবিতে লাগিল, কাহাকেও মনে মনে দোষ দিল না, কাহারও নিন্দা করিল না— চণ্ডীমণ্ডপের দেওয়ালে টাঙানো রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্ত্তির সুমুখে দাঁড়াইয়া ক্রমাগত কাঁদিয়া বলিতে লাগিল, ভগবান, যদি এত দুঃখেই ফেলবে মনে ছিল, তবে এত বড় নিরুপায় ক’রে আমাকে গড়লে কেন? সে যে কত নিরুপায়, সে কথা তাহার অপেক্ষা বেশি আর কেহই জানে না। লেখাপড়া শিখে নাই, কোন রকমের কাজকর্ম্ম জানিত না, জানিত শুধু দুঃখীর সেবা করিতে, শিখিয়াছিল শুধু ভগবানের নাম করিতে। তাহাতে পরের দুঃখ ঘুচিত বটে, কিন্তু অসময়ে আজ নিজের দুঃখ ঘুচিবে কি করিয়া! আর তাহার কিছুই নাই—সমস্ত গিয়াছে। তাই দুঃখের জ্বালায় কতদিন সে মনে মনে ভাবিয়াছে, এখানে আর থাকিবে না, বিরাজকে লইয়া যেখানে দুচোখ যায় যাইবে; কিন্তু এই সাত-পুরুষের ভিটা ছাড়িয়া কোন্ দেব-মন্দিরের দ্বারে বসিয়া, কোন্ গাছের তলায় শুইয়া সে সুখ পাইবে! এই ক্ষুদ্র নদী, এই গাছপালায় ঘেরা বাড়ী, এই ঘরের বাহিরে বসিয়া আজন্ম পরিচিত লোকের মুখ—সমস্ত ছাড়িয়া সে কোন্ দেশে, কোন্ স্বর্গে গিয়া একটা দিনও বাঁচিবে! এই বাটীতে তাহার মা মরিয়াছে, এই চণ্ডীমণ্ডপে সে তাহার মুমূর্ষু পিতার শেষ সেবা করিয়া গঙ্গায় দিয়া আসিয়াছে—এইখানে পুঁটিকে মানুষ করিয়াছে, তাহার বিবাহ দিয়াছে—এই ঘরবাড়ীর মায়া সে কেমন করিয়া কাটাইবে! সে সেইখানে বসিয়া পড়িয়া দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া রুদ্ধস্বরে কাঁদিতে লাগিল। আর এই কি তাহার সব দুঃখ? তাহার বোনটিকে কোথায় দিয়া আসিল, তাহার একটা সংবাদ পর্য্যন্ত পাওয়া যাইতেছে না; কতদিন হইয়া গেল, তাহার মুখ দেখে নাই, তাহার সুতীক্ষ্ণ কণ্ঠের ‘দাদা’ ডাক শুনিতে পায় নাই—পরের ঘরে সে কি পাইতেছে, কত কান্না কাঁদিতেছে, কিছুই সে জানিতে পারে নাই। অথচ বিরাজের কাছে তাহার নামটি করিবার যো নাই। সে তাহাকে মানুষ করিয়াও এমন করিয়া ভুলিতে পারিল, কিন্তু সে ভুলিবে কি করিয়া? তাহার মায়ের পেটের বোন, হাতে কাঁধে করিয়া বড় করিয়াছে, যেখানে গিয়াছে সঙ্গে করিয়া গিয়াছে—সেজন্য কত কথা কত উপহাস সহ্য করিয়াছে, কিন্তু কিছুতেই পুঁটিকে কাঁদাইয়া ঘর ছাড়িয়া এক পা যাইতে পারে নাই। এ সব কথা শুধু সে জানে, আর সেই ছোটবোনটি জানে।
বিরাজ জানিয়াও জানে না। একটা কথা পর্য্যন্ত বলে না। পুঁটির সম্বন্ধে সে যেন পাষাণমূর্ত্তির মত একেবারে চিরদিনের জন্য নির্ব্বাক্ হইয়া গিয়াছে। সে যে মনে মনে তাহার সেই নিরপরাধিনী বোনটিকে অপরাধী করিয়া রাখিয়াছে, এ সম্বন্ধে একবিন্দু আলোচনার পথ পর্য্যন্ত ছিল না। কোনও একটা কথা বলিতে গেলেই বিরাজ থামাইয়া দিয়া বলে, ও কথা থাক্—সে রাজরাণী হ’ক্, কিন্তু তার কথায় কাজ নেই। এই ‘রাজরাণী’ কথাটা বিরাজ এমনভাবে উচ্চারণ করিয়া উঠিয়া যাইত যে, নীলাম্বরের বুকের ভিতরটা জ্বালা করিতে থাকিত। পাছে তাহার উপর গুরুজনের অভিসম্পাত পড়ে, পাছে কোন অকল্যাণ হয়, এই আশঙ্কায় সে মনে মনে ব্যাকুল হইয়া উঠিত, ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করিত, লুকাইয়া ‘হরির লুঠ’ দিয়া নদীতে ভাসাইয়া দিত। এমনই করিয়া তাহার দিন কাটিতেছিল।
দুর্গাপূজা আসিয়া পড়িল। সে আর থাকিতে না পারিয়া গোপনে টাকা সংগ্রহ করিয়া একখানি কাপড় ও কিছু মিষ্টান্ন কিনিয়া সুন্দরীকে গিয়া ধরিল।
সুন্দরী বসিতে আসন দিল, তামাক সাজিয়া দিল, নীলাম্বর আসন গ্রহণ করিয়া তাহার জীর্ণ মলিন উত্তরীয়ের ভিতর হইতে সেই কাপড়খানি বাহির করিয়া বলিল, তুই তাকে মানুষ করেছিস্ সুন্দরী, যা একবার দেখে আয়। আর সে বলিতে পারিল না, মুখ ফিরাইয়া চাদরে চোখ মুছিল।
সুন্দরী ইহাদের কষ্টের কথা জানিত। গ্রামের সকলেই জানিত। কহিল, কেমন আছে বড়বাবু?
নীলাম্বর ঘাড় নাড়িয়া বলিল, জানি নে।
সুন্দরীর বুদ্ধি-বিবেচনা ছিল, সে আর প্রশ্ন করিল না। পরদিন সকালেই যাইবে জানাইতে নীলাম্বর কিছু পাথেয় দিতে গেলে সুন্দরী তাহা গ্রহণ করিল না, কহিল, না বড়বাবু, তুমি কাপড় কিনে ফেলেচ, না হ’লে এও আমি নিয়ে যেতাম না—তোমার মত আমিও যে তাকে মানুষ ক’রেচি।
নীলাম্বরের চোখ দিয়া আবার জল গড়াইয়া পড়িল, সে মুখ ফিরাইয়া ক্রমাগত চোখ মুছিতে লাগিল। এমন একটা সমবেদনার কথা সে কাহারও কাছে পায় নাই। সবাই কহে, সে ভুল করিয়াছে, অন্যায় করিয়াছে, পুঁটি হইতেই তাহাদের সর্ব্বনাশ হইয়াছে। উঠিবার উদ্যোগ করিয়া সে সুন্দরীকে বিশেষ করিয়া সাবধান করিয়া দিল, যেন এই সব দুঃখকষ্টের কথা পুঁটি কোনমতে না জানিতে পারে।
নীলাম্বর চলিয়া গেল, সুন্দরীও এইবার একফোঁটা চোখের জল আঁচলে মুছিল। এই লোকটিকে মনে মনে সবাই ভালবাসিত, সবাই ভক্তি করিত।
সেদিন বিজয়ার অপরাহ্ণ, বিরাজ শোবার ঘরে ঢুকিয়া দোর দিল। সন্ধ্যা না হইতেই কেহ খুড়ো বলিয়া বাড়ী ঢুকিল, কেহ নীলুদা বলিয়া বাহির হইতে চীৎকার করিল।
নীলাম্বর শুষ্কমুখে চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বাহির হইয়া সুমুখে আসিয়া দাঁড়াইল। যথারীতি প্রণাম-কোলাকুলির পর তাহারা বৌঠানকে প্রণাম করিবার জন্য ভিতরের দিকে চলিল।
নীলাম্বর সঙ্গে সঙ্গে আসিয়া দেখিল, বিরাজ রান্নাঘরেও নাই, শোবার ঘরেরও দ্বার রুদ্ধ। সে করাঘাত করিয়া ডাকিল, ছেলেরা তোমাকে প্রণাম কর্তে এসেছে বিরাজ।
বিরাজ ভিতর হইতে বলিল, আমার জ্বর হয়েছে, উঠ্তে পার্ব না।
তাহারা চলিয়া যাইবার খানিক পরেই আবার দ্বারে ঘা পড়িল। বিরাজ জবাব দিল না। দ্বারের বাহিরে মৃদুকণ্ঠে ডাক আসিল, দিদি, আমি মোহিনী—একবার দোর খোল।
তথাপি বিরাজ কথা কহিল না।
মোহিনী কহিল, সে হবে না দিদি, সারা রাত এই দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাক্তে হয়, সে থাক্ব, কিন্তু আজকের দিনে তোমার আশীর্ব্বাদ না নিয়ে যাব না।
বিরাজ উঠিয়া কপাট খুলিয়া সুমুখে আসিয়া দাঁড়াইল; দেখিল, মোহিনীর বাঁ হাতে এক চুপড়ি খাবার, ডান হাতে ঘটিতে সিদ্ধিগোলা। সে পায়ের কাছে নামাইয়া রাখিয়া দুই পায়ের উপর মাথা ঠেকাইয়া প্রণাম করিয়া কহিল, শুধু এই আশীর্ব্বাদ কর দিদি, যেন তোমার মত হ’তে পারি—তোমার মুখ থেকে আমি আর কোন আশীর্ব্বাদ পেতে চাই নে।
বিরাজ চক্ষু আঁচলে মুছিয়া নিঃশব্দে ছোটবধূর অবনত মস্তকে হাত রাখিল।
ছোটবৌ দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিল, আজকের দিনে চোখের জল ফেল্তে নেই, কিন্তু সে কথা ত তোমাকে বল্তে পার্লুম না দিদি; দিদি, তোমার দেহের বাতাস যদি আমার দেহে লেগে থাকে ত সেই জোরে ব’লে যাচ্ছি, আস্ছে বছর এমনই দিনে সে কথা বল্ব।
মোহিনী চলিয়া গেলে বিরাজ সেই সব ঘরে তুলিয়া রাখিয়া স্থির হইয়া বসিল। মোহিনী যে তাহাকে অহর্নিশ চোখে চোখে রাখে, এ কথা আজ সে আরও স্পষ্ট করিয়া বুঝিল। তারপর কত ছেলে আসিল গেল, বিরাজ আর ঘরে দোর দিল না, এই সব দিয়া আজকের দিনের আচার পালন করিল।
পরদিন সকালবেলা সে ক্লান্তভাবে দাওয়ায় বসিয়া শাক বাছিতেছিল, সুন্দরী আসিয়া প্রণাম করিল।
বিরাজ আশীর্ব্বাদ করিয়া বসিতে বলিল।
সুন্দরী বসিয়াই বলিল, রাত্তির হয়ে গেল, তাই আজ সকালেই বল্তে এলুম। কিন্তু যাই বল বৌমা, এমন জান্লে আমি কিছুতেই যেতুম না।
বিরাজ বুঝিতে না পারিয়া চাহিয়া রহিল।
সুন্দরী বলিতে লাগিল, বাড়ীতে কেউ নেই—সবাই গেছে পশ্চিমে হাওয়া খেতে। আছে এক বুড়ো পিসি, তার শক্ত শক্ত কথা কি বৌমা, বলে, ফিরিয়ে নিয়ে যা! জামায়ের পর্য্যন্ত একখানা কাপড় পাঠায় নি, শুধু একখানা সূতোর কাপড় নিয়ে পূজোর তত্ত্ব কত্তে এসেছ! তারপর ছোটলোক, চামার, চোখের চামড়া নেই—এ যে কত বল্লে তা আর বলে কি হবে।
বিরাজ বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন করিল, কে কাকে বল্লে রে?
সুন্দরী বলিল, কেন আমাদের বাবুকে।
বিরাজ অধীর হইয়া উঠিল। সে কিছুই জানিত না, কিছুই বুঝিল না। কহিল, আমাদের বাবুকে কে বল্লে তাই বল।
এবার সুন্দরীও কিছু আশ্চর্য্য হইয়া বলিল, তাই ত এতক্ষণ বল্চি বৌমা! পুঁটির বুড়ো পিস্শাউড়ির কি দপ্প, কি তেজ মা, কাপড়খানা নিলে না, ফিরিয়ে দিলে; বলিয়া কাপড়খানি আঁচলের ভিতর হইতে বাহির করিয়া দিল।
এবার বিরাজ সমস্ত বুঝিল। সে একদৃষ্টে বস্ত্রখানির দিকে চাহিয়া রহিল—তাহার অন্তরে বাহিরে আগুন ধরিয়া গেল।
নীলাম্বর বাহিরে গিয়াছিল, কত বেলায় আসিবে তাহার স্থিরতা নাই, সুন্দরী অপেক্ষা করিতে পারিল না, চলিয়া গেল।
দুপুরবেলা নীলাম্বর আহার করিতে বসিয়াছিল, বিরাজ ঘরে ঢুকিয়া অদূরে সেই কাপড়খানা রাখিয়া দিয়া বলিল, সুন্দরী ফিরিয়ে দিয়ে গেল।
নীলাম্বর মুখ তুলিয়া দেখিয়াই একেবারে ভয়ে ম্লান হইয়া গেল। এই ব্যাপারটা যে এমনভাবে বিরাজের গোচরে আসিতে পারে তাহা সে কল্পনাও করে নাই। এখন কোন প্রশ্ন না করিয়া মাথা হেঁট করিয়া রহিল।
বিরাজ কহিল, কেন তারা নিলে না, কেন গালিগালাজ করে ফিরিয়ে দিলে, সে সব কথা সুন্দরীর কাছে গেলেই শুন্তে পাবে।
তথাপি নীলাম্বর মুখ তুলিল না, কিংবা একটি কথাও শুনিতে চাহিল না।
বিরাজ চুপ করিল।
নীলাম্বরের ক্ষুধাতৃষ্ণা একেবারে চলিয়া গিয়াছিল, সে ভীত অবনত মুখে কেবলই অনুভব করিতে লাগিল—বিরাজ তাহার প্রতি স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া আছে এবং সে দৃষ্টি অগ্নিবর্ষণ করিতেছে।
সন্ধ্যাবেলা সুন্দরীর ঘরে গিয়া সব কথা পুনঃ পুনঃ শুনিয়া নীলাম্বর কহিল, পশ্চিমে যখন বেড়াতে গেছে, তখন সে নিশ্চয়ই ভালই আছে, না সুন্দরী?
সুন্দরী ঘাড় নাড়িয়া বলিল, ভাল আছে বৈ কি বাবু।
নীলাম্বরের মুখ প্রফুল্লভাব ধারণ করিল,—কত বড়টি হয়েছে দেখ্লি?
সুন্দরী হাসিয়া বলিল, দেখা ত হয় নি বাবু!
নীলাম্বর নিজের প্রশ্নে লজ্জিত হইয়া বলিল, তা বটে, কিন্তু দাসী-চাকরের কাছেও শুন্লি ত!
না বাবু! তার পিস্শাশুড়ী মাগীর যে কথাবার্ত্তা, যে হাত-পা নাড়া, তাতে আর জিজ্ঞেস কর্ব কি, পালাতেই পথ পাই নি।
নীলাম্বর ক্ষণকাল ক্ষুব্ধ মুখে স্থির থাকিয়া কহিল, আচ্ছা, পুঁটি আমার রোগা হ’য়ে গেছে, কি একটু মোটাসোটা হয়েচে—তোর কি মনে হয়?
প্রশ্নের উত্তর দিতে সুন্দরী ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল, সংক্ষেপে কহিল, মোটাসোটাই হ’য়ে থাক্বে।
নীলাম্বর আশান্বিত হইয়া উঠিল, প্রশ্ন করিল, শুনে এসেচিস্ বোধ করি, না?
সুন্দরী ঘাড় নাড়িয়া বলিল, না বাবু, শুনে কিছুই আসি নি।
তবে জান্লি কি করে?
এবার সুন্দরী বিরক্ত হইল, কহিল, জান্লুম আর কোথায়? তুমি বল্লে, আমার কি মনে হয়, তাই বল্লুম, হয় ত মোটাসোটা হয়েছে।
নীলাম্বর মাথা নাড়িয়া মৃদুকণ্ঠে বলিল, তা বটে। তারপর কয়েক মুহূর্ত্ত সুন্দরীর মুখের দিকে চুপ করিয়া চাহিয়া থাকিয়া একটা নিশ্বাস ফেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। কহিল, আজ তবে যাই সুন্দরী, আর একদিন আসব।
সুন্দরী তখন হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। বস্তুতঃ তাহার অপরাধ ছিল না। একে ত বলিবার কিছুই ছিল না, তাহাতে ঘণ্টা-দুই হইতে নিরন্তর এক কথা একশ রকম করিয়া বকিয়াও সে নীলাম্বরের কৌতূহল মিটাইতে পারে নাই।
তাড়াতাড়ি কহিল, হাঁ বাবু, রাত হ’ল আজ এস, আর একদিন সকালে এলে সব কথা হবে।
এতক্ষণে নীলাম্বর সুন্দরীর উৎকণ্ঠিত ব্যস্ততা লক্ষ্য করিল এবং আসি বলিয়া চলিয়া গেল।
সুন্দরীর উৎকণ্ঠার একটা বিশেষ হেতু ছিল।
এই সমটায় ও-পাড়ার নিতাই গাঙ্গুলী প্রায় প্রত্যহই একবার করিয়া তাহার সংবাদ লইয়া পায়ের ধুলা দিয়া যাইতেন। তাঁহার এই ধূলাটা পাছে মনিবের সাক্ষাতেই পড়ে, এই আশঙ্কায় সে মনে মনে কণ্টকিত হইয়া উঠিতেছিল। যদিও নানা কারণে এখন তাহার কপাল ফিরিয়াছে এবং জমিদারের অনুগ্রহে লজ্জা গর্ব্বেই রূপান্তরিত হইয়া উঠিয়াছে, তথাপি এই নিষ্কলঙ্ক সাধুচরিত্র ব্রাহ্মণের সম্মুখে হীনতা প্রকাশ পাইবার সম্ভাবনায় সে লজ্জায় মরিয়া যাইতেছিল।
নীলাম্বর চলিয়া গেলে সে পুলকিতচিত্তে দ্বার বন্ধ করিতে আসিল। কিন্তু সুমুখে চাহিতেই দেখিল, নীলাম্বর ফিরিয়া আসিতেছে। সে দোর ধরিয়া বিরক্তমুখে অপেক্ষা করিয়া রহিল। তাহার মুখে দ্বাদশীর চাঁদের আলো পড়িয়াছিল।
নীলাম্বর কাছে আসিয়া একবার ইতস্ততঃ করিল, তাহার পর খুঁট হইতে খুলিয়া একটি আধুলি বাহির করিয়া সলজ্জ মৃদুকণ্ঠে বলিল, তোর কাছে ত বলতে লজ্জা নেই সুন্দরী, সবই জানিস্—এই আধুলিটি শুধু আছে, নে। বলিয়া হাতে তুলিয়া দিতে গেল। সুন্দরী জিভ্ কাটিয়া পিছাইয়া দাঁড়াইল।
নীলাম্বর বলিল, কত কষ্ট দিলাম—যাওয়া-আসার খরচ পর্য্যন্ত দিতে পারি নি। আর সে বলিতে পারিল না, কান্নায় তাহার গলা বন্ধ হইয়া আসিল।
সুন্দরী একমুহূর্ত্ত কি ভাবিল, পরক্ষণে হাত পাতিয়া বলিল, দাও। তুমি যাই হও, আমার চিরদিনের মনিব—আমার না বলা সাজে না। বলিয়া আধুলিটি হাতে লইয়া মাথায় ঠেকাইয়া আঁচলে বাঁধিতে বাঁধিতে বলিল, তবে আর একবার ভিতরে এস, বলিয়া ভিতরে চলিয়া আসিল।
নীলাম্বর পিছনে পিছনে উঠানে আসিয়া দাঁড়াইল।
সুন্দরী ঘরে ঢুকিয়া মিনিট খানেক পরে ফিরিয়া আসিয়া নীলাম্বরের পায়ের কাছে একমুঠা টাকা রাখিয়া ভুমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলা লইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।
নীলাম্বরকে বলিল, অমন ক’রে চেয়ে থাক্লে ত হবে না বাবু, আমি চিরকালের দাসী, শুদ্দুর হ’লেও এ জোর শুধু আমারই আছে, বলিয়া হেঁট হইয়া টাকাগুলি তুলিয়া লইয়া চাদরে বাঁধিয়া দিতে দিতে মৃদুকণ্ঠে বলিল, এ তোমারই দেওয়া টাকা বাবু, তীর্থ কর্ব ব’লে দেবতার নামে তুলে রেখেছিলুম—আর যেতে হ’ল না—দেবতা নিজে ঘরে এসে নিয়ে গেলেন।
নীলাম্বর তখনও কথা কহিতে পারিল না। বেশ করিয়া বাঁধিয়া দিয়া সে বলিল, বৌমা একলা আছেন, আর না, যাও—কিন্তু একথা তিনি যেন কিছুতেই না জান্তে পারেন।
নীলাম্বর কি একটা বলিতে গেল, সুন্দরী বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল, হাজার হ’লেও শুনব না বাবু। আজ আমার মান না রাখ্লে আমি মাথা খুঁড়ে মর্ব। তাহার হাতের মধ্যে তখনও চাদরের সেই অংশটা ধরা ছিল, এমন সময়ে ‘কি হচ্ছে গো?’ বলিয়া নিতাই গাঙ্গুলী খোলা দরজার ভিতর দিয়া একেবারে প্রাঙ্গণে আসিয়া দাঁড়াইল। সুন্দরী চাদর ছাড়িয়া দিল।
নীলাম্বর বাহির হইয়া চলিয়া গেল।
নিতাই ক্ষণকাল অবাক্ হইয়া থাকিয়া বলিল, ও ছোঁড়াটা নীলু নয়?
সুন্দরী মনে মনে রাগিয়া উঠিল, কিন্তু সহজভাবে বলিল, হাঁ আমার মনিব।
শুনি, খেতে পায় না—এত রাত্তিরে যে?
কাজ ছিল, তাই এসেছিলেন।
ও—কাজ ছিল! বলিয়া নিতাই মুখ টিপিয়া একটু হাসিল। ভাবটা এই যে, তাঁহার মত বয়সের লোকের চোখে ধূলি-নিক্ষেপ সহজ কর্ম্ম নয়।
সুন্দরী হাসির অর্থ স্পষ্ট বুঝিল। নিতাইয়ের বয়স পঞ্চাশের উপরে গিয়াছে, মাথার চুল বার আনা পাকিয়াছে—তাহার গোঁফ-দাড়ি কামান, মাথায় শিখা, কপালে সকালের চন্দনের ফোঁটা তখনও রহিয়াছে—সুন্দরী তাহার প্রতি একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল। সে চাহনির অর্থ বোঝা নিতাইয়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না, তাই সে কিছু উত্তেজিত হইয়াই বলিয়া উঠিল, অমন ক’রে চেয়ে আছ যে!
দেখ্চি।
কি দেখ্চ?
দেখ্চি তোমরাও বামুন, আর যিনি চ’লে গেলেন তিনিও বামুন, কিন্তু কি আকাশ-পাতাল তফাৎ।
নিতাই কথাটা বুঝিতে না পারিয়া প্রশ্ন করিল, তফাৎ কিসে?
সুন্দরী একটুখানি হাসিয়া বলিল, বুড়ো মানুষ, আর হিমে থেকো না, দাওয়ায় উঠে ব’স। মাইরি বল্চি গাঙ্গুলিমশাই, তোমার দিকে চেয়ে ভাব্ছিলুম, আমার মনিবের পায়ের এক ফোঁটা ধূলো পেলে তোমাদের মত কতগুলি গাঙ্গুলি কত জন্ম উদ্ধার হ’তে পারে!
তাহার কথা শুনিয়া নিতাই ক্রোধে বিস্ময়ে বাক্শূন্য হইয়া চাহিয়া রহিল। সুন্দরী একটা কলিকা লইয়া তামাক সাজিতে সাজিতে অত্যন্ত সহজভাবে বলিতে লাগিল, রাগ ক’র না ঠাকুর, কথাটা সত্যি। আজ ব’লে নয়, বরাবরই দেখে আস্ছি, ও মনিবের পৈতেগাছটার দিকে চোখ পড়্লে চোখ যেন ঠিক্রে যায়—মনে হয়, ওঁর গলার ওপরে যেন আকাশের বিদ্যুৎ খেলা ক’রে বেড়াচ্চে, কিন্তু তোমাদের দেখ—দেখলেই আমার হাসি পায়। বলিয়া খিল্ খিল্ করিয়া হাসিয়া উঠিল। প্রথম হইতেই নিতাই ঈর্ষায় জ্বলিতেছিল, এখন ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া উঠিল। দুই চোখ আগুনের মত করিয়া চেঁচাইয়া উঠিল, অত দর্প করিস্ নে সুন্দরি, মুখ প’চে যাবে।
সুন্দরী কলিকাটায় ফুঁ দিতে দিতে কাছে আসিয়া সহাস্যে বলিল, কিচ্ছু হবে না—নাও তামাক খাও। বরং তোমার মুখই ম’লে পুড়্বে না- আমার দুঃখী মনিবকে দেখে ঐ মুখে হেসেচ।
নিতাই কলিকাটা টান মারিয়া ফেলিয়া দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। সুন্দরী তাহার উত্তরীয়ের এক অংশ ধরিয়া ফেলিয়া হাসিয়া বলিয়া উঠিল, ব’স ব’স, মাথা খাও। ক্রুদ্ধ নিতাই নিজের উত্তরীয় সজোরে টানিয়া লইয়া—গোল্লায় যাও—গোল্লায় যাও—নিপাত যাও, বলিয়া শাপ দিতে দিতে দ্রুতপদে প্রস্থান করিল।
সুন্দরী সেইখানে বসিয়া পড়িয়া খুব খানিকটা হাসিল, তারপর উঠিয়া আসিয়া সদর-দরজা বন্ধ করিয়া দিল। মৃদু মৃদু বলিতে লাগিল, কিসে আর কিসে! বামুন বলি ওঁকে। এত দুঃখেও মুখে হাসিটি লেগে রয়েচে, তবু চোখ তুলে চাইতে ভরসা হয় না—যেন আগুন জ্বল্চে!