এক বৎসর কাটিয়াছে। এ বৎসর দুই আনা ফসলও পাওয়া যায় নাই। যে জমিগুলি হইতে প্রায় সারা বছরের ভরণপোষণ চলিত, তাহার অনেকটাই ও-পাড়ার মুখুয্যেমশাই কিনিয়া লইয়াছেন। ভদ্রাসন পর্য্যন্ত বাঁধা পড়িয়াছে, ছোটভাই পীতাম্বর গোপনে নিজের নামে ফিরাইয়া লইয়াছে—তাহাও জানাজানি হইয়াছে। হালের একটা গরু মরিয়াছে। পুকুর রোদে ফাটিতেছে—বিরাজ কোনদিকে চাহিয়া আর কূল-কিনারা দেখিতে পাইল না। দেহের কোন একটা স্থান বহুক্ষণ পর্য্যন্ত বাঁধিয়া রাখিলে একটা অসহ্য অব্যক্ত মন্দ যাতনায় সর্ব্বদেহটা যে রকম করিয়া ধীরে ধীরে অবসন্ন হইয়া আসিতে থাকে, সমস্ত সংসারের সহিত সম্বন্ধটা তাহার তেমনই হইয়া আসিতে লাগিল। আগে সে যখন তখন হাসিত, কথায় কথায় ছল ধরিয়া পরিহাস করিত, কিন্তু এখন বাড়ীর মধ্যে এমন একটি লোক নাই যে, সে কথা কহে। অথচ কেহ দেখা করিতে আসিলে, সংবাদ লইতে ইচ্ছা করিলেও সে ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হয়। অভিমানী প্রকৃতি তাহার, পাড়ার লোকের একটা কথাতেও বিদ্রোহী হইয়া উঠে। সংসারের কোন কাজে তাহার যে আর লেশমাত্র উৎসাহ নাই, তাহা তাহার কাজের দিকে চোখ ফিরাইলেই চোখে পড়ে। তাহার ঘরের শয্যা মলিন, কাপড়ের আল্না অগোছান, জিনিসপত্র অপরিচ্ছন্ন—সে ঝাঁট দিয়া ঘরের কোণে জঞ্জাল জড় করিয়া রাখে—তুলিয়া ফেলিয়া দিবার মত জোরও সে যেন নিজের দেহের মধ্যে খুঁজিয়া পায় না। এমনি করিয়া দিন কাটিতেছিল। ইতিমধ্যে নীলাম্বর ছোটবোন হরিমতিকে দুইবার আনিতে চেষ্টা করিয়াছে। তাহারা পাঠায় নাই। দিন-পনর হইল একখানা চিঠি লিখিয়াছিল, হরিমতির শ্বশুর তাহার জবাব পর্য্যন্ত দেয় নাই। কিন্তু বিরাজের কাছে তাহার নামটি পর্য্যন্ত করিবার যো নাই। সে একেবারে আগুনের মত জ্বলিয়া উঠে। পুঁটিকে মানুষ করিয়াছে। মায়ের মত ভালবাসিয়াছে, কিন্তু তাহার সমস্ত সংস্রব পর্য্যন্ত আজকাল তাহার কাছে বিষ হইয়া গিয়াছে।
আজ সকালে নীলাম্বর গ্রামের পোষ্ট অফিস হইতে ঘুরিয়া আসিয়া বিমর্ষমুখে ঘরে ঢুকিয়া বলিল, পুঁটির শ্বশুর একটা জবাব পর্য্যন্ত দিলে না—এ পূজোতেও বোধ করি বোনটিকে একবার দেখতে পেলাম না।
বিরাজ কাজ করিতে করিতে একবার মুখ তুলিল। কি একটা বলিতে গেল, কিন্তু কিছুই না বলিয়া উঠিয়া গেল।
সেই দিন দুপুরবেলা আহারে বসিয়া নীলাম্বর আস্তে আস্তে বলিল, তার নাম কর্লেও তুমি জ্বলে ওঠ—সে কি কোন দোষ করেছে?
বিরাজ অদূরেই বসিয়াছিল, চোখ তুলিয়া বলিল, জ্বলে উঠি কে বল্লে?
কে আর বল্বে, আমি নিজেই টের পাই।
বিরাজ ক্ষণকাল স্বামীর মুখপানে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, পেলেই ভাল, বলিয়াই উঠিয়া যাইতেছিল, নীলাম্বর ডাকিয়া বলিল, আচ্ছা, আজকাল এমন হয়ে উঠ্ছ কেন? এ যেন একেবারে বদলে গেছ!
বিরাজ ফিরিয়া দাঁড়াইয়া কথাটা মন দিয়া শুনিয়া বলিল, বদলালেই বদলাতে হয়, বলিয়া বাহির হইয়া গেল। ইহার দুই-তিনদিন পরে অপরাহ্ণ-বেলায় নীলাম্বর বাহিরের চণ্ডীমণ্ডপে একা বসিয়া গুন গুন করিয়া গান গাহিতেছিল, বিরাজ আসিয়া কিছুক্ষণ নিঃশব্দে থাকিয়া সুমুখে আসিয়া দাঁড়াইল।
নীলাম্বর মুখ তুলিয়া বলিল, কি?
বিরাজ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল, জবাব দিল না।
নীলাম্বর মুখ নীচু করিতেই বিরাজ রুক্ষ্মস্বরে বলিল, আর একবার মুখ তোল দেখি!
নীলাম্বর মুখও তুলিল না, জবাব দিল না, চুপ করিয়া রহিল।
বিরাজ পূর্ব্ববৎ কঠিনভাবে বলিল, এই যে বেশ রাঙা হয়েছে, আবার ঐগুলো খেতে সুরু করেছ?
নীলাম্বর কথা কহিল না। ভয়ে চোখ নীচু করিয়া কাঠের মূর্ত্তির মত বসিয়া রহিল। একে ত চিরদিনই সে তাহাকে ভয় করে, তাহাতে কিছুদিন হইতেই বিরাজ এমনই একরাশি উত্তপ্ত বারুদের মত হইয়া আছে যে, কখন কি ভাবে জ্বলিয়া উঠিবে তাহা আন্দাজ পর্য্যন্ত করিবার যো ছিল না।
বিরাজও কিছুক্ষণ স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিয়া বলিল, সেই ভাল, গাঁজা-গুলি খেয়ে বোম্-ভোলা হয়ে ব’সে থাক্বার এই ত সময়, বলিয়া বাড়ীর মধ্যে চলিয়া গেল। সেদিন গেল, তার পরদিন নীলাম্বর আর থাকিতে না পারিয়া সমস্ত লজ্জাসঙ্কোচ ত্যাগ করিয়া সকালবেলা পীতাম্বরকে বাহিরের ঘরে ডাকিয়া আনিয়া বলিল, পুঁটির শ্বশুর ত একটা জবাব পর্য্যন্ত দিলে না—তুই একবার চেষ্টা করে দেখ্ না, যদি বোনটিকে দুটো দিনের তরেও আন্তে পারিস্।
পীতাম্বর দাদার মুখপানে চাহিয়া বলিল, তুমি থাক্তে আমি আবার কি চেষ্টা কর্ব?
নীলাম্বর তাহার শঠতা বুঝিয়া ভিতরে ভিতরে ক্রুদ্ধ হইল। কিন্তু যথাসাধ্য গোপন করিয়া বলিল, তা হোক্, যেমন আমার, তোরও ত সে তেমনই বোন। না হয় মনে কর্ না, আমি ম’রে গেছি—এখন তুই শুধু এক্লা আছিস্।
পীতাম্বর কহিল, যা সত্যি নয়, তা তোমার মত আমি মনে কর্তে পারি নে। আর তোমাকে চিঠির জবাব দিলে না, আমাকেই বা দেবে কেন?
নীলাম্বর ছোটভাইয়ের এ কথাটাও সহ্য করিয়া লইয়া বলিল, যা সত্যি নয়, তাই আমি মনে করি? আচ্ছা তাই ভাল, এ নিয়ে তোর সঙ্গে আমি ঝগ্ড়া কর্তে চাই নে, কিন্তু আমার চিঠির জবাব দেয় না এই জন্যে যে, আমি বিয়ের সমস্ত সর্ত্ত পালন কর্তে পারি নি। কিন্তু সে সব কথার জন্যে ত তোকে ডাকি নি—যা বল্চি, পারিস্ কি না, তাই বল্।
পীতাম্বর মাথা নাড়িয়া বলিল, না, বিয়ের আগে আমাকে জিজ্ঞেস্ করেছিলে?
কর্লে কি হত?
পীতাম্বর বলিল, ভাল পরামর্শই দিতুম।
নীলাম্বরের মাথার মধ্যে আগুন জ্বলিতে লাগিল, তাহার ওষ্ঠাধর কাঁপিতে লাগিল, তবুও সে নিজেকে সংবরণ করিয়া লইয়া বলিল, তা হ’লে পার্বি নে?
পীতাম্বর বলিল, না। আর পুঁটির শ্বশুরও যা, নিজের শ্বশুরও তাই—এঁরা গুরুজন। তিনি যখন পাঠাতে ইচ্ছে করেন না, তখন তাঁর বিরুদ্ধে আমি কথা কইতে পারি নে—ও স্বভাব আমার নয়।
তাহার কথা শুনিয়া নীলাম্বরের একবার ইচ্ছা হইল, ছুটিয়া গিয়া লাথি মারিয়া উহার ঐ মুখ গুঁড়া করিয়া ফেলে, কিন্তু নিজেকে সাম্লাইয়া ফেলিয়া দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিল, যা, বেরো—যা আমার সাম্নে থেকে।
পীতাম্বর ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল, বলিল, খামকা রাগ কর কেন দাদা? না গেলে তুমি কি আমাকে জোর ক’রে তাড়াতে পার?
নীলাম্বর দরজার দিকে হাত প্রসারিত করিয়া বলিল, বুড়ো বয়সে মার খেয়ে যদি না মর্তে চাস্, সরে যা আমার সুমুখ থেকে!
তথাপি পীতাম্বর কি একটা বলিতে যাইতেছিল। কিন্তু নীলাম্বর বাধা দিয়া বলিল, বাস্! একটি কথাও না—যাও।
গোঁয়ার নীলাম্বরের গায়ের জোর প্রসিদ্ধ ছিল।
পীতাম্বর আর কথা কহিতে সাহস করিল না, আস্তে আস্তে বাহির হইয়া গেল।
বিরাজ গোলমাল শুনিয়া বাহিরে আসিয়া স্বামীর হাত ধরিয়া ঘরের মধ্যে টানিয়া লইয়া গিয়া বলিল, ছি, সমস্ত জেনে শুনে কি ভাইয়ের সঙ্গে কেলেঙ্কারী কর্তে আছে?
নীলাম্বর উদ্ধতভাবে জবাব দিল, জানি ব’লে কি ভয়ে জড়সড় হ’য়ে থাক্ব? আমার সব সহ্য হয় বিরাজ, ভণ্ডামী সহ্য হয় না।
বিরাজ বলিল, কিন্তু তুমি ত একা নও, আজ হাত ধরে বার করে দিলে কাল কোথায় দাঁড়াবে, সে কথা একবার ভাব কি?
নীলাম্বর বলিল, না। যিনি ভাব্বার তিনি ভাব্বেন, আমি ভেবে মিথ্যে দুঃখ পাই নে।
বিরাজ জবাব দিল, তা ঠিক্। যার কাজের মধ্যে খোল বাজান আর মহাভারত পড়া—তার ভাবনা চিন্তে মিছে!
কথাগুলা বিরাজ মধুর করিয়া বলে নাই, নীলাম্বরের কানেও তাহা মধু বর্ষণ করিল না, তথাপি সে সহজভাবে বলিল, ওগুলো আমি সব চেয়ে বড় কাজ ব’লেই মনে করি। তা ছাড়া, ভাবতে থাক্লেই কি কপালের লেখা মুছে যাবে? বলিয়া সে একবার কপালে হাত দিয়া বলিল, চেয়ে দেখ্ বিরাজ, এইখানে লেখা ছিল ব’লে অনেক রাজা-মহারাজাকে গাছতলায় বাস কর্তে হয়েচে—আমি ত অতি তুচ্ছ।
বিরাজ অন্তরের মধ্যে দগ্ধ হইয়া যাইতেছিল, বলিল, ও-সব মুখে বলা যত সহজ, কাজে করা তত সহজ নয়। তা ছাড়া তুমিই না হয় গাছতলায় বাস কর্তে পার, আমি ত পারি নে। মেয়েমানুষের লজ্জা সরম আছে—আমাকে খোসামোদ করে হ’ক্, দাসীবৃত্তি করে হ’ক্, একটুখানি আশ্রয়ের মধ্যে বাস কর্তেই হবে। ছোটভাইয়ের মন যুগিয়ে থাক্তে না পার, অন্ততঃ হাতাহাতি ক’রে সব দিক্ মাটী ক’র না। বলিয়া সে চোখের জল চাপিয়া দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল।
স্বামী-স্ত্রীতে ইতিপূর্ব্বে অনেকবার অনেক কলহ হইয়া গিয়াছে। নীলাম্বর তাহা জানিত, কিন্তু আজ যাহা হইয়া গেল তাহা কলহ নহে—এ মূর্ত্তি তাহার কাছে একেবারেই অপরিচিত। সে স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
কয়েক মুহূর্ত্ত পরেই বিরাজ আবার ঘরে ঢুকিয়া বলিল, অমন হতভম্ব হ’য়ে দাঁড়িয়ে রইলে কেন? বেলা হয়েছে—যাও, স্নানাহ্নিক করে দুটো খাও—যে কটা দিন পাওয়া যায়, সেই কটা দিনই লাভ। বলিয়া আর একবার সে স্বামীর বুকে শূল বিঁধিয়া দিয়া বাহির হইয়া গেল।
এই ঘরের দেওয়ালে একটি রাধাকৃষ্ণের পট ঝোলান ছিল, সেইদিকে চাহিয়াঁ নীলাম্বর হঠাৎ কাঁদিয়া ফেলিল; কিন্তু পাছে কেহ জানিতে পায়, এই ভয়ে তৎক্ষণাৎ চোখ মুছিয়া বাহির হইয়া গেল।
আর বিরাজ? সেদিন সমস্ত দিন ধরিয়া কেবলই তাহার চোখে যখন তখন জল আসিয়া পড়িতে লাগিল। যাঁহার এতটুকু কষ্ট সে সহিতে পারিত না, তাঁহাকে এত বড় শক্ত কথা নিজের মুখে বলিয়া অবধি তাহার দুঃখ ও আত্মগ্লানির সীমা ছিল না, সমস্ত দিন জলস্পর্শ করিল না, কাঁদিয়া কাঁদিয়া মিছামিছি এ-ঘর ও-ঘর করিয়া ফিরিল, তাহার পর সন্ধ্যার সময় তুলসীতলায় দীপ জ্বালিয়া গলায় আঁচল দিয়া প্রণাম করিয়াই একেবারে ফুঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল।
সমস্ত বাড়ী নির্জ্জন, নিস্তব্ধ। নীলাম্বর বাড়ী নাই, তিনি দুপুরবেলা একটিবার মাত্র পাতের কাছে বসিয়াই উঠিয়া গিয়াছিলেন, এখনও ফিরিয়া আসেন নাই।
বিরাজ কি করিবে, কোথায় যাইবে, কাহার কাছে কি বলিবে—আজ কোন দিকে চাহিয়া কোন উপায় দেখিতে না পাইয়া সেইখানে অন্ধকার উঠানের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল; কেবলই বলিতে লাগিল, অন্তর্যামী ঠাকুর, একটিবার মুখ তুলে চাও। যে লোক কোন দোষ, কোন পাপ কর্তে জানে না, তাকে আর কষ্ট দিও না ঠাকুর—আর আমি সইতে পার্ব না।
রাত্রি তখন নটা বাজিয়া গিয়াছিল, নীলাম্বর নিঃশব্দে আসিয়া শয্যায় শুইয়া পড়িল।
বিরাজ ঘরে ঢুকিয়া পায়ের কাছে বসিল।
নীলাম্বর চাহিয়াও দেখিল না, কথাও কহিল না।
খানিক পরে বিরাজ স্বামীর পায়ের উপর একটা হাত রাখিতেই তিনি পা সরাইয়া লইলেন। আরও মিনিট-পাঁচেক নিস্তব্ধে কাটিল—বিরাজের লুপ্ত অভিমান ধীরে ধীরে সজাগ হইয়া উঠিতে লাগিল, তথাপি সে মৃদুস্বরে বলিল, খাবে চল।
নীলাম্বর চুপ করিয়া রহিল। বিরাজ বলিল, সমস্ত দিন যে খেলে না, এটা কার ওপর রাগ ক’রে শুনি?
ইহাতেও নীলাম্বর জবাব দিল না।
বিরাজ বলিল, বল না শুনি?
নীলাম্বর উদাসভাবে বলিল, শুনে কি হবে?
বিরাজ বলিল, তবু শুনিই না।
এবার নীলাম্বর অকস্মাৎ উঠিয়া বসিল, বিরাজের মুখের উপর দুই চোখ সুতীক্ষ্ণ শূলের মত উদ্যত করিয়া বলিল, তোর আমি গুরুজন বিরাজ, খেলার জিনিস নয়।
তাহার চোখের চাহনি, গলার শব্দ শুনিয়া বিরাজ সভয়ে চমকিয়া স্তব্ধ হইয়া গেল। এমন আর্ত্ত, এমন গভীর কণ্ঠস্বর সে ত কোন দিন শুনে নাই!