পুঁটি দাদাকে মুহূর্ত্তের বিশ্রাম দেয় না। পূজার সময় হইতে পৌষের শেষ পর্য্যন্ত ক্রমাগত নগরের পর নগরে, তীর্থের পর তীর্থে টানিয়া লইয়া ফিরিতেছে। তার অল্প বয়স, সুস্থ সবল দেহ, অসীম কৌতূহল, তাহার সহিত সমানে পা ফেলিয়া চলা নীলাম্বরের সাধ্যাতীত—সে শ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছে অথচ কোথাও বসিয়া একটুখানি জিরাইয়া লইবার ইচ্ছা না হইয়া কেন যে সমস্ত দেহটা তাহার ঘরের পানে চাহিয়া অহর্নিশ কাঁদিয়া কাঁদিয়া নালিশ জানাইতেছে, ইহাও সে বুঝিতে পারিতেছে না। কি আছে দেশে? কেন এমন স্বাস্থ্যকর স্থানে মন বসে না? ছোটবৌ মাঝে মাঝে পুঁটিকে চিঠি দেয়; তাহাতেও এমন কোনও কথা থাকে না, তথাপি সেই বন-জঙ্গলের অবিশ্রাম টানে তাহার শীর্ণ দেহ কঙ্কালসার হইয়া উঠিতে লাগিল। পুঁটি চায়—দাদা সব ভুলিয়া আবার তেমনি হয়। তেমনই সুস্থ সদানন্দ, তেমনই মুখে মুখে গান, তেমনই কারণে অকারণে উচ্চহাসির অফুরন্ত ভাণ্ডার। কিন্তু দাদা তাহার সমস্ত চেষ্টা নিষ্ফল করিতে বসিয়াছে। আগে সে এমন ভাবিয়া দেখে নাই, হতাশ হয় নাই; মনে করিত, আর দুদিন যাক্। কিন্তু দুদিন করিয়া চার-পাঁচ মাস কাটিয়া গেল, কৈ কিছুই ত হইল না! বাড়ী ছাড়িয়া আসিবার দিনে মোহিনীর কথায় ব্যবহারে বিরাজের উপর তাহার একটা করুণার ভাব আসিয়াছিল, তাহার কথাগুলা বিশ্বাসও করিয়াছিল। দাদা ভাল হইয়া গেলে ছেলেবেলার কথা মনে করিয়া সে হয় ত মনে মনে তাহাকে সম্পূর্ণ ক্ষমা করিতেও পারিত। বস্তুতঃ ক্ষমা করিবার জন্য, সেই বৌদিদিকে একটুখানি মাধুর্য্যের সহিত স্মরণ করিবার জন্য এ সময়ে নিজেও ব্যাকুল হইয়াছিল, কিন্তু সে সুযোগ তাহার মিলিতেছে কৈ! দাদা ভাল হইতেছে কৈ! একে ত সংসারে এমন কোনও দুঃখ, কোনও হেতু সে কল্পনা করিতেও পারে না, যাহাতে এই মানুষটিকে এত দুঃখে ফেলিয়া রাখিয়া কেহ সরিয়া দাঁড়াইতে পারে। বৌদি ভাল হউক, মন্দ হউক, পুঁটি আর ভ্রূক্ষেপ করে না, কিন্তু ত্যাগ করিয়া যাইবার অমার্জ্জনীয় অপরাধে যে স্ত্রী অপরাধিনী, তাহার প্রতি বিদ্বেষেরও তাহার যেন অন্ত রহিল না। সেই হতভাগিনীকে প্রত্যহ স্মরণ করিয়া, তাহার বিচ্ছেদ এমন করিয়া মনে মনে পালন করিয়া, যে মানুষ নিজেকে ক্ষয় করিয়া আনিতেছে, তাহারও প্রতি তাহার চিত্ত প্রসন্ন হইল না।
একদিন সকালে সে মুখ ভার করিয়া আসিয়া বলিল, দাদা, বাড়ী যাই চল। নীলাম্বর কিছু বিস্মিত হইয়াই বোনের মুখের পানে চাহিল, কারণ মাঘ মাসটা প্রয়াগে কাটাইবার কথা ছিল। পুঁটি দাদার মনের ভাব বুঝিয়া বলিল, একটা দিনও আর থাক্তে চাই নে, কালই যাব।
তাহার রুষ্ট ভাব অবলোকন করিয়া নীলাম্বর একটুখানি বিষণ্ণভাবে হাসিয়া বলিল, কেন রে পুঁটি?
পুঁটি এতক্ষণ জোর করিয়া চোখের জল চাপিয়া রাখিয়াছিল, এবার কাঁদিয়া ফেলিল। অশ্রু-বিকৃত কণ্ঠে বলিতে লাগিল, কি হবে থেকে? তোমার ভাল লাগচে না, তুমি যাই যাই ক’রে প্রতিদিন শুকিয়ে উঠ্চ, না আমি কিছুতেই একদিনও থাকব না।
নীলাম্বর সস্নেহে তাহার হাত ধরিয়া টানিয়া কাছে বসাইয়া বলিল, ফিরে গেলেই কি ভাল হয়ে যাব রে? এ দেহ সার্বে ব’লে আর আমার ভরসা হয় না পুঁটি—তাই চল্ বোন, যা হবার ঘরে গিয়েই হোক্।
দাদার কথা শুনিয়া পুঁটি অধিকতর কাঁদিয়া উঠিয়া বলিল, কেন তুমি সদাসর্ব্বদা তাকে এমন ক’রে ভাব্বে? শুধু ভেবেই ত এমন হ’য়ে যাচ্চ।
কে বললে, আমি তাকে সর্ব্বদা ভাবি?
পুঁটি তেমনই ভাবে জবাব দিল, কে আবার বল্বে, আমি নিজেই জানি।
তুই তাকে ভাবিস্ নে?
পুঁটি চোখ মুছিয়া উদ্ধতভাবে বলিল, না, ভাবি নে। তাকে ভাব্লে পাপ হয়।
নীলাম্বর চমকিত হইল—কি হয়?
পাপ হয়। তার নাম মুখে আন্লে মুখ অশুচি হয়, মনে আন্লে স্নান করতে হয়, বলিয়াই সে সবিস্ময়ে চাহিয়া দেখিল, দাদার স্নেহকোমল দৃষ্টি এক নিমিষে পরিবর্ত্তিত হইয়া গিয়াছে। নীলাম্বর বোনের মুখের দিকে চাহিয়া কঠিন স্বরে বলিল, পুঁটি!
ডাক শুনিয়া সে ভীত ও অত্যন্ত কুণ্ঠিত হইয়া পড়িল। সে দাদার বড় আদরের বোন, ছেলে-বেলাতেও সহস্র অপরাধে কখনও এমন চোখ দেখে নাই, এমন গলা শুনে নাই। এখন বড় বয়সে বকুনি খাইয়া তাহার ক্ষোভে ও অভিমানে মাথা হেঁট হইয়া গেল।
নীলাম্বর আর কিছু না বলিয়া উঠিয়া গেলে, সে চোখে আঁচল দিয়া ফুঁপাইয়া কাঁদিতে লাগিল। দুপুর-বেলা দাদার আহারের সময় কাছে গেল না, অপরাহ্ণে দাসীর হাতে খাবার পাঠাইয়া দিয়া আড়ালে দাঁড়াইয়া রহিল।
নীলাম্বর ডাকিল না, কথাটি বলিল না।
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। নীলাম্বর আহ্নিক শেষ করিয়া সেই আসনে চুপ করিয়া বসিয়া আছে, পুঁটি নিঃশব্দে ঘরে ঢুকিয়া পিছনে আসিয়া হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া দাদার পিঠের উপর মুখ রাখিল। এটা তাহার নালিশ করার ধরণ। ছেলে-বেলায় অপরাধ করিয়া বৌদির তাড়া খাইয়া এমনই করিয়া সে অভিযোগ করিত। নীলাম্বরের সহসা তাহা মনে পড়িয়া দুই চোখ সজল হইয়া উঠিল, মাথায় হাত দিয়া কোমলস্বরে বলিল, কি রে?
পুঁটি পিঠ ছাড়িয়া দিয়া কোলের উপর উপুড় হইয়া মুখ গুজিয়া কাঁদিতে লাগিল। নীলাম্বর তাহার মাথার উপর একটা হাত রাখিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বহুক্ষণ পরে পুঁটি কান্নার সুরে বলিল, আর বল্ব না দাদা!
নীলাম্বর হাত দিয়া তাহার চুলগুলি নাড়িতে নাড়িতে বলিল, না, আর ব’ল না।
পুঁটি চুপ করিয়া পড়িয়া রহিল। নীলাম্বর তাহার মনের কথা বুঝিয়া মৃদুস্বরে কহিল, সে তোর গুরুজন। শুধু সম্পর্কে নয় পুঁটি, তোকে মায়ের মত মানুষ ক’রে তোর মায়ের মতই হয়েচে। অপরে যা ইচ্ছে বলুক, কিন্তু তোর মুখে ও-কথায় গভীর অপরাধ হয়। পুঁটি চোখ মুছিতে মুছিতে বলিল, কেন সে আমাদের এমন ক’রে ফেলে রেখে গেল?
কেন যে গেল পুঁটি, সে শুধু আমি জানি, আর যিনি সর্ব্বান্তর্যামী তিনি জানেন। সে নিজেও জান্ত না—তখন সে পাগল হয়েছিল, তার এতটুকু জ্ঞান থাক্লে সে আত্মহত্যাই কর্ত, এ কাজ কর্ত না।
পুঁটি আর একবার চোখ মুছিয়া ভাঙা গলায় বলিল, কিন্তু এখন তবে কেন আসে না দাদা?
কেন আসে না? আস্বার যো নেই ব’লেই আসে না দিদি, বলিয়া সে নিজেকে জোর করিয়া সংবরণ করিয়া লইয়া ক্ষণকাল পরেই বলিল, যে অবস্থায় আমাকে ফেলে রেখে গেছে, তার এতটুকু ফের্বার পথ থাক্লে, সে ফিরে আস্ত—একটা দিনও কোথাও থাক্ত না। এ কথা কি তুই নিজেই বুঝিস্ নে পুঁটি?
পুঁটি মুখ ঢাকিয়া রাখিয়াই ঘাড় নাড়িয়া বলিল, বুঝি দাদা—
নীলাম্বর উদ্দীপ্ত হইয়া বলিল, তাই বল্ বোন। সে আস্তে চায়, পায় না। সে যে কি শাস্তি পুঁটি, তা তোরা দেখ্তে পাস্ নে বটে, কিন্তু চোখ বুজলেই আমি তা দেখি। সেই দেখাই আমাকে নিত্য ক্ষয় ক’রে আন্চে রে, আর কিছুই নয়।
পুঁটি কাঁদিয়া ফেলিল।
নীলাম্বর হাত দিয়া নিজের চোখ মুছিয়া লইয়া বলিল, সে তার দুটো সাধের কথা আমাকে যখন তখন বল্ত। এক সাধ, শেষ সময়ে আমার কোলে যেন মাথা রাখ্তে পায়; আর সাধ, সীতা-সাবিত্রীর মত হ’য়ে মরণের পরে যেন তাদের কাছেই যায়। হতভাগীর সব সাধই ঘুচেচে।
পুঁটি চুপ করিয়া শুনিতে লাগিল।
নীলাম্বর রুদ্ধকণ্ঠ পরিষ্কার করিয়া লইয়া বলিল, তোরা সবাই তার অপবাদ দিস্, বারণ করতে পারি নে ব’লে আমিও চুপ ক’রে থাকি, কিন্তু ভগবানকে ফাঁকি দিই কি ক’রে বল্ দেখি? তিনি ত দেখ্চেন, কার ভুল, কার অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে সে ডুবে গেল! তুই বল, আমি কোন্ মুখে তার দোষ দিই, আমি তাকে আশীর্ব্বাদ না ক’রে কি ক’রে থাকি! না বোন, সংসারের চোখে সে যত কলঙ্কিনীই হোক, তার বিরুদ্ধে আমার কোন ক্ষোভ, কোন নালিশ নাই। নিজের দোষে এ জন্মে তাকে পেয়েও হারালাম, ভগবান করুন, যেন পরজন্মেও তাকে পাই।
সে আর বলিতে পারিল না, এইখানে তাহার গলা একেবারে ধরিয়া গেল। পুঁটি তাড়াতাড়ি উঠিয়া আঁচল দিয়া দাদার চোখ মুছাইয়া দিতে গিয়া নিজেও কাঁদিয়া ফেলিল; সহসা তাহার মনে হইল, দাদা যেন কোথায় সরিয়া যাইতেছে। কাঁদিয়া বলিল, যেখানে ইচ্ছে চল দাদা, কিন্তু আমি তোমাকে একটি দিনও কোথাও একলা ছেড়ে দেব না।
নীলাম্বর মুখ তুলিয়া একটুখানি হাসিল।
বিরাজ জগন্নাথের পথে ফিরিয়া আসিতেছিল। এই পথ ধরিয়া যখন সে অনুদ্দিষ্ট মৃত্যুশয্যার অনুসন্ধানে গিয়াছিল, সেই যাওয়ার আর এই আসার কি প্রভেদ! এখন সে বাড়ি যাইতেছে। তাহার দুর্ব্বল দেহ পথে যতই সকাতরে বিশ্রাম ভিক্ষা চাহিতে লাগিল, সে ততই ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত হইয়া উঠিতে লাগিল। কোন কারণে কোথাও বিলম্ব করিতে সে সম্মত নয়। তাহার কাসি যক্ষ্মায় পরিণত হইয়াছে, ইহা সে টের পাইয়াছিল, তাই আশঙ্কার অবধি ছিল না, পাছে যাওয়া না ঘটে। ছেলে-বেলা হইতে একটা বিশ্বাস তাহার বড় দৃঢ় ছিল, দেহ নিষ্পাপ না হইলে কেহ স্বামীর পায়ে মরিতে পায় না। সে এই উপায়ে মরণের পূর্ব্বে একবার নিজের দেহটাকে যাচাই করিয়া লইতে চায়—তাহার প্রায়শ্চিত্ত সম্পূর্ণ হইয়াছে কি না। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিলে সে নির্ভয়ে মহানন্দে জীবনের পরপারে দাঁড়াইয়া তাঁর জন্য অপেক্ষা করিয়া বসিয়া থাকিবে। কিন্তু দামোদরের এধারে আসিয়া তাহার হাত-পা ফুলিয়া উঠিল, মুখ দিয়া অধিক পরিমাণে রক্ত পড়িতে লাগিল—আর কিছুতেই পা চলিল না। সে হতাশ হইয়া একটা গাছতলায় ফিরিয়া আসিয়া ভয়ে কাঁদিতে লাগিল। এ কি ভয়ানক অপরাধ যে, এত করিয়াও তাহার শেষ আশা মিটিল না! তাহার এ জন্ম গেল, পরজন্মেও আশা নাই, তবে সে আর কি করিবে! আশা নাই, তবুও সে গাছতলায় পড়িয়া সারাদিন হাত জোড় করিয়া স্বামীর পায়ে মিনতি জানাইতে লাগিল।
পরদিন তারকেশ্বরের কাছাকাছি কোথায় হাটবার ছিল। প্রভাত হইতে সে পথে গরুর গাড়ী চলিতে লাগিল। সে সাহসে ভর করিয়া এক বৃদ্ধ গাড়োয়ানকে আবেদন করিল। বুড়ো মানুষ তাহার কান্না দেখিয়া, সম্মত হইয়া তাহাকে গাড়ী করিয়া তারকেশ্বরে পৌঁছাইয়া দিয়া গেল। বিরাজ স্থির করিল, এই মন্দিরের আশে-পাশে কোথাও সে পড়িয়া থাকিবে। এখানে কত লোক আসে যায়, যদি কোন উপায়ে একবার ছোটবৌয়ের কাছে সংবাদ পাঠাইতে পারে।
কঠিন ব্যাধিপীড়িত কত নর-নারী, কত কামনায় এই দেব-মন্দির ঘেরিয়া ইতস্ততঃ পড়িয়া আছে, তাহাদের মধ্যে আসিয়া বিরাজ অনেকদিনের পর একটু শান্তি অনুভব করিল। তাহাদের মত তাহারও ব্যাধি আছে, কামনা আছে, সে তাই লইয়া এখানে নীরবে পড়িয়া থাকিতে পাইবে, কাহারও দৃষ্টি আকর্ষণ করিবে না, কাহারও অর্থহীন কৌতূহল চরিতার্থ করিতে হইবে না মনে করিয়া এত দুঃখের মাঝেও আরাম পাইল। কিন্তু রোগ দ্রুত বাড়িয়া চলিতে লাগিল। মাঘের এই দুর্জ্জয় শীতে ও অনাহারে ছয়দিন কাটিয়া গেল, কিন্তু আর কাটিবে বলিয়াও আশা হইল না, কেহ আসিবে বলিয়াও ভরসা রহিল না। ভরসা রহিল শুধু মৃত্যুর—সে তারই জন্য আর একবার নিজেকে প্রস্তুত করিতে লাগিল।
সেদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়াছিল, অপরাহ্ণ না হইতেই আঁধার বোধ হইতে লাগিল। ও-বেলায় তাহার মুখ দিয়া অনেকখানি রক্ত উঠায় মৃতকল্প দেহটা যেন একেবারে নিঃশেষে ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছিল। সে মনে মনে বলিল, বুঝি আজই সব সাঙ্গ হইবে এবং তখন হইতেই মন্দিরের পিছনে মুখ গুঁজিয়া পড়িয়াছিল। দ্বিপ্রহরে ঠাকুরের পূজা হইয়া গেলে অন্যদিনের মত উঠিয়া বসিয়া নমস্কার করিতে পারিল না—মনে মনে করিল। এতদিন স্বামীর চরণে সে শুধু মিনতি জানাইয়াই আসিয়াছে। সে অবোধ নয়, যে কাজ করিয়া ফেলিয়াছে, তাহাতে এ জন্মের কোন দাবী রাখে নাই, শুধু পরজন্মের অধিকার না যায়, ইহাই চাহিয়াছে। না বুঝিয়া অপরাধ করায় শাস্তি যেন এ জন্ম অতিক্রম করিয়া পরজন্ম পর্য্যন্ত ব্যাপ্ত না হইতে পায়, এই ভিক্ষাই মাগিয়াছে। কিন্তু বেলা অবসানের সঙ্গে সঙ্গে তাহার চিন্তার ধারা সহসা এক আশ্চর্য্য পথে ফিরিয়া গেল। ভিক্ষার ভাব রহিল না, বিদ্রোহের ভাব দেখা দিল। সমস্ত চিত্ত ভরিয়া এক অপূর্ব্ব অভিমানের সুর অনির্ব্বচনীয় মাধুর্য্যে বাজিয়া উঠিল। সে তাহাতেই মগ্ন হইয়া কেবলই মনে মনে বলিতে লাগিল, কেন তবে তুমি বলেছিলে!
অজ্ঞাতসারে কখন তাহার পঙ্গু বাঁ হাতখানি স্খলিত হইয়া পথের উপর পড়িয়াছিল, সে টের পায় নাই, সহসা তাহারই উপর একটা কঠিন ব্যথা পাইয়া সে অস্ফুটস্বরে কাতরোক্তি করিয়া উঠিল। এটা যাতায়াতের পথ। যে ব্যক্তি না দেখিয়া এই অবশ শীর্ণ হাতখানি মাড়াইয়া দিয়াছিল, সে অতিশয় লজ্জিত ব্যথিত হইয়া ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, আহা হা—কে গা, এমন ক’রে পথের ওপর শুইয়াছ? বড় অন্যায় করেচি—বেশি লাগে নি ত?
চক্ষের পলকে বিরাজ মুখের কাপড় সরাইয়া চাহিয়া দেখিল, তারপর আর একটা অস্ফুট ধ্বনি করিয়া চুপ করিল। এই ব্যক্তি নীলাম্বর। সে একবার একটুকু ঝুঁকিয়া দেখিয়া সরিয়া গেল।
কিছুক্ষণ হইল সূর্য্য অস্ত গেল। পশ্চিম-দিগন্তে মেঘ ছিল না, দিক্-চক্রবালবিচ্ছুরিত স্বর্ণাভা মন্দিরের চূড়ায়, গাছের আগায় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, নীলাম্বর দুরে দাঁড়াইয়া পুঁটিকে কহিল, ওই রোগা মেয়েমানুষটিকে বড় মাড়িয়ে দিয়েচি বোন, দেখ, দেখি যদি কিছু দিতে পারিস্—বোধ করি ভিক্ষুক।
পুঁটি চাহিয়া দেখিল, স্ত্রীলোকটি একদৃষ্টে তাহাদেরই দিকে চাহিয়া আছে। তাই সে ধীরে ধীরে কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার মুখের কিয়দংশ বস্ত্রাবৃত, তথাপি যেন মনে হইল, এ মুখ যেন সে পূর্ব্বে দেখিয়াছে। জিজ্ঞাসা করিল, হাঁ গা তোমার বাড়ী কোথায়?
সাতগাঁয়ে, বলিয়া স্ত্রীলোকটি হাসিল।
বিরাজের সব চেয়ে মধুর সামগ্রী ছিল তাহার মুখের হাসি; সমস্ত সংসারের মধ্যে কাহারও ভুল করিবার যো ছিল না। ওগো এ যে বৌদি, বলিয়া সেই মুহূর্ত্তেই পুটি সেই জীর্ণ-শীর্ণ দেহের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া মুখে মুখ দিয়া কাঁদিয়া উঠিল।
নীলাম্বর দূরে দাঁড়াইয়া দেখিতেছিল, কথাবার্ত্তা শুনিতে না পাইলেও সমস্ত বুঝিল। সে কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। একবার তাহার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিল, তারপর শান্ত-কণ্ঠে বলিল, এখানে কাঁদিস্ নে পুঁটি, ওঠ্, বলিয়া ভগিনীকে সরাইয়া দিয়া স্ত্রীর শীর্ণ দেহ ক্ষুদ্র শিশুটির মত বুকে তুলিয়া লইয়া দ্রুতপদে বাসার দিকে চলিয়া গেল।
চিকিৎসার জন্য উত্তম স্বাস্থ্যকর স্থানে যাইবার জন্য বিরাজকে অনেক সাধ্যসাধনা করা হইয়াছিল, কিন্তু কোনমতেই তাহাকে রাজী করান যায় নাই। আর ঘর ছাড়িয়া যাইতে সে কিছুতেই সম্মত হইল না।
নীলাম্বর পুঁটিকে আড়ালে ডাকিয়া বলিয়া দিল, আর ক’টা দিন বোন? যেখানে যেমন ক’রে ও থাকতে চায় দে। আর ওকে তোরা পীড়াপীড়ি করিস্ নে।
তারকেশ্বরে স্বামীর কোলে মাথা রাখিয়া সে প্রথম আবেদন জানাইয়াছিল, তাহাকে ঘরে লইয়া চল, তাহার নিজের শয্যার উপরে শোয়াইয়া দাও। ঘরের উপর, ঘরের প্রতি সামগ্রীটির উপর এবং স্বামীর উপর তাহার কি যে ভীষণ তৃষ্ণা, তাহা যে কেহ চোখে দেখে সে-ই উপলব্ধি করিয়া কাঁদিয়া ফেলে। দিবারাত্রির অধিকাংশ সময়ই সে জ্বরে আচ্ছন্নের মত পড়িয়া থাকে, কিন্তু একটু সজাগ হইলেই ঘরের প্রতি বস্তুটি তন্ন তন্ন করিয়া চাহিয়া দেখে।
নীলাম্বর শয্যা ছাড়িয়া প্রায়ই কোথাও যায় না এবং প্রায়ই সজল চক্ষে প্রার্থনা করে, ভগবান, অনেক শাস্তি দিয়াছ, এইবার ক্ষমা কর। যে লোক পরলোকে যাত্রা করিতেছে, তাহার ইহলোকের মোহ কাটাইয়া দাও।
গৃহত্যাগিনীর গৃহের উপর এই নিদারুণ আকর্ষণ দেখিয়া সে মনে মনে কণ্টকিত হইয়া উঠিতে থাকে। দুই সপ্তাহ গত হইয়াছে। কাল হইতে তাহার বিকারের লক্ষণ প্রকাশ পাইয়াছিল। আজ সারাদিন ভুল বকিয়া কিছুক্ষণ পূর্ব্বে ঘুমাইয়াছিল, সন্ধ্যার পর চোখ মেলিয়া চাহিল। পুঁটি কাঁদিয়া কাটিয়া পায়ের কাছে পড়িয়া ঘুমাইতেছে। ছোটবৌ শিয়রের কাছে বসিয়া আছে, তাহাকে দেখিয়া বলিল, ছোটবৌ না?
ছোটবৌ মুখের উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া বলিল, হাঁ দিদি, আমি মোহিনী।
পুঁটি কোথায়?
ছোটবৌ হাত দিয়া দেখাইয়া বলিল, তোমার পায়ের কাছে ঘুমোচ্চে।
উনি কৈ?
ও-ঘরে আহ্নিক ক’চ্চেন।
তবে আমিও করি, বলিয়া সে চোখ বুজিয়া মনে মনে জপ করিতে লাগিল। অনেকক্ষণ পরে ডান হাত ললাটে স্পর্শ করিয়া নমস্কার করিল, তারপর ছোটবৌয়ের মুখের পানে ক্ষণকাল নিঃশব্দে চাহিয়া থাকিয়া আস্তে আস্তে বলিল, বোধ করি আজই চললুম বোন, কিন্তু আবার যেন দেখা হয়, আবার যেন তোকেই এমন কাছে পাই।
বিরাজের সময় যে একেবারে শেষ হইয়া আসিয়াছিল, কাল হইতে তাহা সকলেই টের পাইয়াছিল, তাহার কথা শুনিয়া ছোটবৌ নিঃশব্দে কাঁদিতে লাগিল।
বিরাজের বেশ জ্ঞান হইয়াছে। সে কণ্ঠস্বর আরও নত করিয়া চুপি চুপি বলিল, ছোটবৌ, সুন্দরীকে একবার ডাকতে পারিস্?
ছোটবৌ রুদ্ধস্বরে বলিল, আর তাকে কেন দিদি? সে আস্বে না।
আস্বে রে আস্বে। একবার ডাকা—আমি তাকে মাপ ক’রে আশীর্ব্বাদ ক’রে যাই। আর আমার কারও ওপর রাগ নেই, কারও ওপর কোনও ক্ষোভ নেই। ভগবান আমাকে যখন ক্ষমা ক’রে আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, আমিও তখন সকলকে ক্ষমা ক’রে যেতে চাই।
ছোটবৌ কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, এ আর ক্ষমা কি দিদি? বিনা অপরাধে এত দণ্ড দিয়েও তাঁর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হ’ল না—তোমাকে নিতে বসেছেন। একটা হাত নিলেন, তবুও তোমাকে আমাদের কাছে ফেলে রেখে দিতেন—
বিরাজ হাসিয়া উঠিল; বলিল, কি করতিস্ আমাকে নিয়ে? পাড়ায় দুর্নাম রটেছে—আমার বেঁচে থাকায় আর ত লাভ নেই বোন!
ছোটবৌ গলায় জোর দিয়া বলিয়া উঠিল, আছে দিদি, তা ছাড়া ও ত মিথ্যে দুর্নাম—ওতে আমরা ভয় করি নে।
তোরা করিস্ নে, আমি করি। দুর্নাম মিথ্যে নয়, খুব সত্যি। আমার অপরাধ যতটুকুই হয়ে থাক্ ছোটবৌ, তারপরে আর হিন্দুর ঘরের মেয়ের বাঁচা চলে না। তোরা ভগবানের দয়া নেই বল্চিস্, কিন্তু—
তাহার কথাটা শেষ হইবার পূর্ব্বেই পুঁটি উচ্ছ্বসিত কান্নার সুরে চেঁচাইয়া উঠিল, ওঃ ভারি দয়া ভগবানের!
এতক্ষণ সে চুপ করিয়া কাঁদিতেছিল—আর শুনিতেছিল। আর সে সহ্য করিতে না পারিয়া অমন করিয়া উঠিল। কাঁদিয়া বলিল, তাঁর এতটুকু বিচার নেই। যারা আসল পাপী তাদের কিছু হ'ল না, আর আমাদেরই তিনি এমনই করে শাস্তি দিচ্চেন!
তাহার কান্নার দিকে চাহিয়া বিরাজ নিঃশব্দে হাসিতে লাগিল। কি মধুর, কি বুক-ভাঙ্গা হাসি। তারপরে কৃত্রিম ক্রোধের স্বরে বলিল, চুপ কর্ পোড়ারমুখী, চেঁচাস্ নে।
পুঁটি ছুটিয়া আসিয়া তাহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া উচ্চৈস্বরে কাঁদিয়া উঠিল, তুমি ম’রো না বৌদি, আমরা কেউ সইতে পার্ব না। তুমি ওষুধ খাও—আর কোথাও চল—তোমার দুটি পায়ে পড়ি বৌদি, আর দুটো দিন বাঁচ।
তাহার কান্নার শব্দে আহ্নিক ফেলিয়া নীলাম্বর ত্রস্তপদে কাছে আসিয়া শুনিতে লাগিল, পুঁটির যা মুখে আসিল, তাই বলিয়া বাঁচিবার জন্য বৌদিকে ক্রমাগত অনুনয় করিতে লাগিল। এইবার বিরাজের দুই চোখ বাহিয়া বড় বড় অশ্রুর ফোঁটা ঝরিয়া পড়িল। ছোটবৌ সযত্নে তাহা মুছাইয়া দিয়া পুঁটিকে টানিয়া লইতেই, সে তাহার বুকের মধ্যে মুখ লুকাইয়া সকলকে কাঁদাইয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল। বহুক্ষণ পরে বিরাজ অনবরত ভগ্নকণ্ঠে বলিতে লাগিল, কাঁদিস্ নে পুঁটি, শোন্।
নীলাম্বর আড়ালে দাঁড়াইয়া শুনিতে লাগিল, বিরাজের চৈতন্য সম্পূর্ণ ফিরিয়া আসিয়াছে। তাহার যন্ত্রণার অবসান হইয়াছে তাহা সে বুঝিল। বিরাজ বলিতে লাগিল, না বুঝে তাঁর দোষ দিস্ নে পুঁটি। কি সূক্ষ্ম বিচার, তবু যে কত দয়া সে কথা আমার চেয়ে কেউ বেশি জানে না। আমি গেলেই তোরা বুঝ্বি। আর বল্চিস্—একটা হাত আর একটা চোখ নিয়েচেন, সে ত দুদিন আগে যেতই। কিন্তু এইটুকু শাস্তি দিয়ে তিনি তোদের কোলে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েচেন সেটা তোরা কি ক’রে ভুল্বি পুঁটি!
ছাই ফিরিয়ে দিয়েছেন, বলিয়া পুঁটি কাঁদিতেই লাগিল।
ভগবানের দয়া বা সূক্ষ্ম বিচারের একটা বর্ণও সে বিশ্বাস করিল না। বরং সমস্ত ব্যাপারটা তাহার কাছে গভীর অত্যাচার ও অবিচার বলিয়াই মনে হইতে লাগিল। খানিকপরে বিরাজ বলিল, পুঁটি, অনেকক্ষণ দেখি নি রে, তোর দাদাকে একবার ডাক্।
নীলাম্বর আড়ালেই ছিল, আসিতেই ছোটবৌ বিছানা ছাড়িয়া সরিয়া দাঁড়াইল। নীলাম্বর শিয়রে বসিয়া স্ত্রীর ডান হাতটা সাবধানে নিজের হাতে তুলিয়া নাড়ী দেখিতে লাগিল। সত্যই বিরাজের আর কিছু ছিল না। সে যে জ্বরের উপর এত কথা বলিতেছে এবং ইহারই অবসানের সঙ্গে খুব সম্ভব সমস্তই শেষ হইবে, তাহা সে পূর্ব্বেই অনুমান করিয়াছিল, এখন তাহাই বুঝিল।
বিরাজ বলিল, বেশ হাত দেখ, বলিয়াই হাসিল।
সহসা সে মর্ম্মান্তিক পরিহাস করিয়া ফেলিল। এই উপলক্ষ করিয়াই যে এত কাণ্ড ঘটিয়াছে, তাহা সকলেরই মনে পড়িয়া গেল। বেদনায় নীলাম্বরের মুখ বিবর্ণ লইয়া গিয়াছে, বিরাজও বোধ করি তাহা দেখিতে পাইল। সে তৎক্ষণাৎ অনুতপ্ত হইয়া বলিল, না, না, তা বলিনি—সত্যিই বল্চি, আর কত দেরি? বলিয়া চেষ্টা করিয়া নিজের মাথা স্বামীর ক্রোড়ে তুলিয়া দিয়া বলিল, সকলের সুমুখে আর একবার তুমি বল, আমাকে মাপ করেছ?
নীলাম্বর রুদ্ধস্বরে ‘ক’রেচি’ বলিয়া হাত দিয়া চোখ মুছিল।
বিরাজ ক্ষণকাল চোখ বুজিয়া থাকিয়া মৃদুকণ্ঠে বলিতে লাগিল, জ্ঞানে, অজ্ঞানে, এতদিনের ঘরকন্নায় কতই না দোষঘাট করেচি—ছোটবৌ, তুমিও শোন, পুঁটি তুইও শোন্ দিদি, তোমরা সব ভুলে আজ আমাকে বিদেয় দাও—আমি চল্লুম, বলিয়া সে হাত বাড়াইয়া স্বামীর পদতল খুঁজিতে লাগিল। নীলাম্বর মাথার বালিশটা এক পাশে সরাইয়া দিয়া উপরে পা তুলিতেই বিরাজ হাত দিয়া ক্রমাগত পায়ের ধুলা মাথায় দিতে দিতে বলিল, আমার সব দুঃখ এতদিনে সার্থক হ’ল—আর কিছু নেই। দেহ আমার শুদ্ধ নিষ্পাপ—এইবার যাই, গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি গে। বলিয়া সে পাশ ফিরিয়া ক্রোড়ের মধ্যে মুখ গুঁজিয়া অস্ফুটস্বরে কহিল, এমনই ক’রে আমাকে নিয়ে থাক, কোথাও যেও না, বলিয়া সে নীরব হইল। সে শ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল।
সকলেই শুষ্কমুখে বসিয়া রহিল। রাত্রি বারোটার পর হইতে সে ভুল বকিতে লাগিল। নদীতে ঝাঁপাইয়া পড়ার কথা—হাসপাতালের কথা—কিন্তু সব কথার মধ্যে অত্যুগ্র একাগ্র পতিপ্রেম মুহূর্ত্তের ভ্রমে কি করিয়া সে সতী-সাধ্বীকে দগ্ধ করিয়াছে শুধুই তাই।
এ কয়দিন তাহারই সুমুখে বসিয়া নীলাম্বরকে আহার করিতে হইত; সেদিন মাঝে মাঝে সে পুঁটিকে ডাকিয়া ছোটবৌকে ডাকিয়া বকিতে লাগিল। তারপর ভোর-বেলায় সমস্ত ডাকাডাকি দমন করিয়া দীর্ঘশ্বাস উঠিল। আর সে চাহিল না, আর সে কথা কহিল না, স্বামীর দেহে মাথা রাখিয়া সূর্য্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই দুঃখিনীর সমস্ত দুঃখের অবসান হইয়া গেল।