বিরাজ বৌ · শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Chapter 11: অধ্যায় 11

মগরার এতদিনের পিতলের কব্জার কারখানা যেদিন সহসা বন্ধ হইয়া গেল এবং এই খবরটা চাঁড়ালদের সেই মেয়েটি বিরাজকে দিতে আসিয়া ছাঁচ বিক্রীর অভাবে নিজের নানাবিধ ক্ষতি ও অসুবিধার বিবরণ অনর্গল বকিতে লাগিল, বিরাজ তখন চুপ করিয়া শুনিল। তারপর একটি ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলিল মাত্র। মেয়েটি মনে করিল, তাহার দুঃখের অংশী মিলিল না, তাই ক্ষুণ্ণ হইয়া ফিরিয়া গেল। হায় রে, অবোধ দুঃখীর মেয়ে, তুই কি করিয়া বুঝিবি সেইটুকু নিশ্বাসে কি ছিল, সে নীরবতার আড়ালে কি ঝড় বহিতে লাগিল! শান্ত নির্ব্বাক্ ধরিত্রীর অন্তস্তলে কি আগুন জ্বলে, সে বুঝিবার ক্ষমতা তুই কোথায় পাইবি!

নীলাম্বর আসিয়া বলিল, সে কাজ পাইয়াছে। আগামী পূজার সময় হইতে কলিকাতার এক নামজাদা কীর্ত্তনের দলের সে খোল বাজাইবে।

খবর শুনিয়া বিরাজের মুখ মৃতের মত রক্তহীন হইয়া গেল। তাহার স্বামী গণিকার অধীনে, গণিকার সংস্রবে, সমস্ত ভদ্র-সমাজের সম্মুখে গাহিয়া বাজাইয়া ফিরিবে, তবে আহার জুটিবে! লজ্জায় ধিক্কারে সে মাটির সহিত মিশিয়া যাইতে লাগিল, মুখ ফুটিয়া নিষেধ করিতেও পারিল না—আর যে কোন উপায় নাই। সন্ধ্যার অন্ধকারে নীলাম্বর সে মুখের ছবি দেখিতে পাইল না—ভালই হইল।

ভাঁটার টানে জল যেমন প্রতি মুহূর্ত্ত ক্ষয়-চিহ্ন তট-প্রান্তে আঁকিতে আঁকিতে দূর হইতে সুদূরে সরিয়া যায়, ঠিক তেমনই করিয়া বিরাজ শুকাইতে লাগিল। দ্রুত অতি সুস্পষ্টভাবে ঠিক তেমনই করিয়া তাহার দেহতটের সমস্ত মলিনতা নিরন্তর অনাবৃত করিয়া দিয়া তাহার দেববাঞ্ছিত অতুল যৌবন-শ্রী কোথায় অন্তর্হিত হইয়া যাইতে লাগিল। দেহ শুষ্ক, মুখ ম্লান, দৃষ্টি অস্বাভাবিক—যেন কি একটা ভয়ঙ্কর বস্তু সে অহরহঃ দেখিতেছে। অথচ তাহাকে দেখিবার কেহ নাই। ছিল শুধু ছোটবৌ; সেও মাসাধিক কাল ভায়ের অসুখে বাপের বাড়ি গিয়াছে। নীলাম্বর দিনের বেলা প্রায়ই ঘরে থাকে না। যখন আসে তখন রাত্তির আঁধার; তাহার দুই চোখ প্রায়ই রাঙা, নিশ্বাস উষ্ণ বহে। বিরাজ সবই দেখিতে পায়, সবই বুঝিতে পারে, কিন্তু কোন কথাই বলে না। বলিতে ইচ্ছাও করে না, তাহার সামান্য কথাবার্ত্তা কহিতেও এমনি ক্লাস্তি বোধ হয়।

কয়েকদিন হইল, বিকাল হইতে তাহার শীত করিয়া মাথা ধরিয়া উঠিতেছিল, এই লইয়াই তাহাকে স্তিমিত সন্ধ্যা-দীপটি হাতে করিয়া রান্নাঘরে প্রবেশ করিতে হইত। স্বামী বাড়ি থাকেন না বলিয়া, দিনের বেলা আর সে প্রায়ই রাঁধিত না, রাত্রে ভাত রাঁধিত, কিন্তু তখন তাহার জ্বর। স্বামীর খাওয়া হইয়া গেলে হাত-পা ধুইয়া শুইয়া পড়িত। এমনই করিয়া তাহার দিন কাটিতেছিল। ঠাকুর-দেবতাকে বিরাজ আর মুখ তুলিয়া চাহিতেও বলে না, পূর্ব্বের মত প্রার্থনাও জানায় না। আহ্নিক শেষ করিয়া গলায় আঁচল দিয়া যখন প্রণাম করে, তখন শুধু মনে মনে বলে, ঠাকুর, যে পথে যাচ্ছি, সে পথে যেন একটু শিগ্‌গির ক’রে যেতে পাই।

সেদিন ছিল শ্রাবণের সংক্রান্তি। সকাল হইতে ঘন-বৃষ্টিপাতের বিরাম ছিল না। তিন দিন জ্বরভোগের পর বিরাজ ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আকুল হইয়া সন্ধ্যার পর বিছানায় উঠিয়া বসিল। নীলাম্বর বাড়ি ছিল না। পরশু স্ত্রীর এত জ্বর দেখিয়াও তাহাকে শ্রীরামপুরের এক ধনাঢ্য শিষ্যের বাটীতে কিছু প্রাপ্তির আশায় যাইতে হইয়াছে, কিন্তু কথা ছিল, কোনমতেই রাত্রিবাস করিবে না, যেমন করিয়া হোক সেই দিন সন্ধ্যা নাগাদ ফিরিয়া আসিবে। পরশু গিয়াছে, কাল গিয়াছে, আজও যাইতে বসিয়াছে, তাঁহার দেখা নাই। অনেকদিনের পর আজ সমস্ত দিন ধরিয়া বিরাজ যখন তখন কাঁদিতেছে। আর কিছুতেই শুইয়া থাকিতে না পারিয়া, সন্ধ্যা জ্বালিয়া দিয়া একটা গামছা মাথায় ফেলিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে বাহিরে পথের ধারে আসিয়া দাঁড়াইল। বর্ষার অন্ধকারের মধ্যে যতদূর পারিল চাহিয়া দেখিল, কিন্তু কোথাও কিছু দেখিতে না পাইয়া ফিরিয়া আসিয়া ভিজা কাপড়ে ভিজা চুলে, চণ্ডীমণ্ডপের পৈঠায় হেলান দিয়া বসিয়া এতক্ষণ পরে আবার কাঁদিতে লাগিল। কি জানি, তাঁর কি ঘটিল! একে দুঃখে কষ্টে অনাহারে দেহ তাঁহার দুর্ব্বল, তাহাতে পরিশ্রম—কোথাও অসুখ হইয়া পড়িলেন, না গাড়ী-ঘোড়া চাপা পড়িলেন, কি হইল, কি সর্ব্বনাশ ঘটিল—ঘরে বসিয়া সে কি করিয়া বলিবে, কেমন করিয়া কি উপায় করিবে। আর একটা বিপদ, বাড়িতে পীতাম্বরও নাই, কাল বৈকালে সে ছোটবৌকে আনিতে গিয়াছে, সমস্ত বাড়ির মধ্যে বিরাজ একেবারে একা। আবার সে নিজেও পীড়িত। আজ দুপুর হইতে তাহার জ্বর হইয়াছিল বটে, কিন্তু ঘরে এমন এতটুকু কিছু ছিল না যে সে খায়। দুদিন শুধু জল খাইয়া আছে। জলে ভিজিয়া তাহার শীত করিতে লাগিল, মাথা ঘুরিতে লাগিল, সে কোনমতে হাতে পায়ে ভর দিয়া পৈঠা ছাড়িয়া চণ্ডীমণ্ডপের ভিতরে ঢুকিয়া মাটির উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া মাথা খুঁড়িতে লাগিল।

সদর দরজায় ঘা পড়িল, বিরাজ একবার কান পাতিয়া শুনিল। দ্বিতীয় করাঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই ‘যাই’ বলিয়া চোখের পলকে ছুটিয়া আসিয়া কপাট খুলিয়া ফেলিল। অথচ মুহূর্ত্ত পূর্ব্বে সে উঠিয়া বসিতেও পারিতেছিল না।

যে করাঘাত করিতেছিল, সে ও-পাড়ার চাষাদের ছেলে। বলিল, মাঠাকরুণ, দাঠাকুর একটা শুক্‌না কাপড় চাইলে—দাও।

বিরাজ ভাল বুঝিতে পারিল না, চৌকাঠে ভর দিয়া কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া বলিল, কাপড় চাইলেন? কোথায় তিনি?

ছেলেটি জবাব দিল, গোপাল ঠাকুরের বাপের গতি ক’রে এই সবাই ফিরে এলেন যে।

গতি ক’রে? বিরাজ স্তম্ভিত হইয়া রহিল। গোপাল চক্রবর্ত্তী তাহাদের দুর-সম্পর্কীয় জ্ঞাতি। তাহার বৃদ্ধ পিতা বহুদিন যাবৎ রোগে ভুগিতেছিলেন, দিন-দুই পূর্ব্বে তাঁহাকে ত্রিবেণীতে গঙ্গাযাত্রা করান হইয়াছিল, আজ দ্বিপ্রহরে তিনি মরিয়াছেন, দাহ করিয়া এইমাত্র সকলে ফিরিয়া আসিয়াছে। ছেলেটি সব সংবাদ দিয়া শেষকালে জানাইল, দাদাঠাকুরের মত এ অঞ্চলে কেউ নাড়ী ধর্‌তে পারে না, তাই তিনিও সেই দিন হ’তে সঙ্গে ছিলেন।

বিরাজ টলিতে টলিতে ভিতরে আসিয়া তাহার হাতে একখানা কাপড় দিয়া শয্যা আশ্রয় করিল।

জনপ্রাণীশূন্য অন্ধকার ঘরের মধ্যে তাহার স্ত্রী একা, জ্বরে দুশ্চিন্তায় অনাহারে মৃতকল্প, সমস্ত জানিয়া শুনিয়াও যাহার স্বামী বাহিরে পরোপকার করিতে নিযুক্ত, সেই হতভাগিনীর বলিবার বা কহিবার আর কি বাকি থাকে! আজ তাহার অবসন্ন বিকৃত মস্তিষ্ক তাহাকে বারংবার দৃঢ়স্বরে বলিয়া দিতে লাগিল, বিরাজ, সংসারে তোর কেউ নেই। তোর মা নেই, ভাই নেই, বোন নেই—স্বামীও নেই। আছে শুধু যম। তাঁর কাছে ভিন্ন তোর জুড়াবার আর দ্বিতীয় স্থান নেই। বাহিরে বৃষ্টির শব্দে, ঝিল্লীর ডাকে, বাতাসের স্বননে কেবল নাই নাই শব্দই তাহার দুই কানের মধ্যে নিরন্তর প্রবেশ করিতে লাগিল। ভাঁড়ারে চাল নেই, গোলায় ধান নেই, বাগানে ফল নেই, পুকুরে মাছ নেই, সুখ নেই, শান্তি নেই—স্বাস্থ্য নেই—বাড়িতে ছোটবৌ নেই, সকলের সঙ্গে আজ তাহার স্বামীও নেই। অথচ আশ্চর্য্য এই যে, কাহারও বিরুদ্ধে বিশেষ কোন ক্ষোভের ভাবও তাহার মনে উঠিল না। এক বৎসর পূর্ব্বে স্বামীর এই হৃদয়হীনতার শতাংশের একাংশ বোধ করি তাহাকে ক্রোধে পাগল করিয়া তুলিত; কিন্তু আজ কি এক রকম স্তব্ধ অবসাদ তাহাকে অসাড় করিয়া আনিতে লাগিল।

এমনই নির্জ্জীবের মত পড়িয়া থাকিয়া সে কত কি ভাবিয়া দেখিতে চাহিল; ভাবিতে লাগিল, কিন্তু সমস্ত ভাবনাই এলো-মেলো। অথচ ইহারই মধ্যে অভ্যাসবশে হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল—কিন্তু সমস্ত দিন তাঁর খাওয়া হয় নি যে!

আর শুইয়া থাকিতে পারিল না, ত্বরিত-পদে বিছানা ছাড়িয়া প্রদীপ হাতে ভাঁড়ারে ঢুকিয়া তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিতে লাগিল, রাঁধিবার মত যদি কোথাও কিছু থাকে। কিন্তু কিছু নাই—একটা কণাও তাহার চোখে পড়িল না। বাহিরে আসিয়া খুঁটি ঠেস দিয়া এক মুহূর্ত্ত স্থির হইয়া দাঁড়াইল, তারপর হাতের প্রদীপ ফুঁ দিয়া নিবাইয়া রাখিয়া খিড়কির কবাট খুলিয়া বাহির হইয়া গেল। নিবিড় অন্ধকার! ভীষণ স্তব্ধতা, ঘন গুল্মকণ্টকাকীর্ণ সঙ্কীর্ণ পিছল পথ, কিছুই আজ তাহার গতিরোধ করিল না। বাগানের অপর প্রান্তে বনের মধ্যে চাঁড়ালদের ক্ষুদ্র কুটীর, সে সেই দিকে চলিল। বাহিরে প্রাচীর ছিল না, বিরাজ একেবারে প্রাঙ্গণের উপরে দাঁড়াইয়া ডাকিল, তুলসী!

ডাক শুনিয়া তুলসী আলো হাতে বাহিরে আসিয়া বিস্ময়ে অবাক্ হইয়া গেল—এই আঁধারে তুমি কেন মা!

বিরাজ কহিল, চাট্টি চাল দে!

চাল দেব? বলিয়া তুলসী হতবুদ্ধি হইয়া রহিল। এই অদ্ভুত প্রার্থনার কোন অর্থ খুঁজিয়া পাইল না।

বিরাজ তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, দাঁড়িয়ে থাকিস্ নে তুলসী, একটু শিগ্‌গির ক’রে দে।

তুলসী আরও দু-একটা প্রশ্নের পর চাল আনিয়া বিরাজের আঁচলে বাঁধিয়া দিয়া বলিল, কিন্তু এ মোটা চালে কি কাজ হবে মা? এ ত তোমরা খেতে পারবে না!

বিরাজ ঘাড় নাড়িয়া বলিল, পার্‌ব।

তারপর তুলসী আলো লইয়া পথ দেখাইতে চাহিল। বিরাজ নিষেধ করিয়া বলিল, কাজ নেই, তুই একা ফিরে আসতে পারবি নে। বলিয়া নিমেষের মধ্যে অন্ধকারে অদৃশ্য হইয়া গেল।

আজ চাঁড়ালের ঘরে সে ভিক্ষা করিতে আসিয়াছিল, ভিক্ষা করিয়া লইয়া গেল, অথচ এত বড় অপমান তাহাকে তেমন বিঁধিল না—শোক, দুঃখ, অপমান, অভিমান, কোন বস্তুরই তীব্রতা অনুভব করিবার শক্তি তাহার দেহে ছিল না।

বাড়ি ফিরিয়া দেখিল নীলাম্বর আসিয়াছে। স্বামীকে সে তিন দিন দেখে নাই, চোখ পড়িবামাত্রই দেহের প্রতি রক্তবিন্দুটি পর্য্যন্ত উদ্দাম হইয়া উঠিয়া একটা দুর্নিবার আকর্ষণ প্রচণ্ড গতিতে তাহাকে ক্রমাগত ঐ দিকে টানিতে লাগিল, কিন্তু এখন আর তাহাকে এক পা টলাইতে পারিল না।

তীব্র তড়িৎ-সংস্পর্শে ধাতু যেমন শক্তিময় হইয়া উঠে, স্বামীকে কাছে পাইয়া চক্ষের নিমিষে সে তেমনই শক্তিময়ী হইয়া উঠিয়াছিল। তথাপি সমস্ত আকর্ষণের বিরুদ্ধে সে স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া এক দৃষ্টে চাহিয়া রহিল।

নীলাম্বর একটিবার মাত্র মুখ তুলিয়াই ঘাড় হেঁট করিয়াছিল, সেই দৃষ্টিতেই বিরাজ দেখিয়াছিল, তাঁহার দুই চোখ জবার মত ঘোর রক্তবর্ণ—মড়া পোড়াইতে গিয়া তাহারা যে এই তিন দিন অবিশ্রাম গাঁজা খাইয়াছে সে কথা তাহার অগোচর রহিল না। মিনিট পাঁচ-ছয় এইভাবে থাকিয়া কাছে সরিয়া জিজ্ঞাসা করিল, খাওয়া হয় নি?

নীলাম্বর বলিল, না।

বিরাজ আর কোন প্রশ্ন না করিয়া রান্নাঘরে যাইতেছিল, নীলাম্বর সহসা ডাকিয়া বলিল, শোন, এত রাত্তিরে একা কোথায় গিয়েছিলে?

বিরাজ দাঁড়াইয়া পড়িয়া এক মুহূর্ত্ত ইতস্ততঃ করিয়া বলিল, ঘাটে।

নীলাম্বর অবিশ্বাসের স্বরে বলিল, না ঘাটে তুমি যাও নি।

তবে যমের বাড়ি গিয়েছিলুম, বলিয়া বিরাজ রান্নাঘরে চলিয়া গেল। ঘণ্টাখানেক পরে ভাত বাড়িয়া যখন সে ডাকিতে আসিল, নীলাম্বর তখন চোখ বুজিয়া ঝিমাইতেছিল। অত্যধিক গাঁজার মহিমায় তাহার মাথা তখন উত্তপ্ত এবং বুদ্ধি আচ্ছন্ন হইয়াছিল। সে সোজা হইয়া উঠিয়া বসিয়া পূর্ব্ব প্রশ্নের অনুবৃত্তিস্বরূপে কহিল, কোথা গিয়েছিলে?

বিরাজ নিজের উদ্যত জিহ্বাকে সজোরে দংশন করিয়া নিবৃত্তি করিয়া শান্তভাবে বলিল, আজ খেয়ে শোও, সে কথা কাল শুনো।

নীলাম্বর মাথা নাড়িয়া বলিল, না, আজই শুন্‌ব। কোথায় গিয়েছিলে বল?

তাহার জিদের ভঙ্গি দেখিয়া এত দুঃখেও বিরাজ হাসিল, বলিল, যদি না বলি?

বল্‌তেই হবে, বল।

আমি তা কিছুতেই বল্‌ব না। আগে খেয়ে শোও তখন শুন্‌তে পাবে।

নীলাম্বর এ হাসিটুকু লক্ষ্য করিল না, দুই চোখ বিস্ফারিত করিয়া মুখ তুলিল—সে চোখে আর আচ্ছন্ন ভাব নাই, হিংসা ও ঘৃণা ফুটিয়া বাহির হইতেছে; ভীষণ কণ্ঠে বলিল, না, কিছুতেই না, কোনমতেই না। না শুনে তোমার ছোঁয়া জল পর্য্যন্ত খাব না।

বিরাজ চম্‌কাইয়া উঠিল, বুঝি কালসর্প দংশন করিলেও মানুষ এমন করিয়া চম্‌কায় না। সে টলিতে টলিতে দ্বারের কাছে পিছাইয়া গিয়া মাটিতে বসিয়া পড়িয়া বলিল, কি বল্‌লে? আমার ছোঁয়া জল পর্য্যন্ত খাবে না?

না, কোনমতেই না।

কেন?

নীলাম্বর চেঁচাইয়া উঠিয়া বলিল, আবার জিজ্ঞেস্ কচ্চ কেন?

বিরাজ নিঃশব্দে স্থিরদৃষ্টিতে স্বামীর মুখের প্রতি চাহিয়া থাকিয়া অবশেষে ধীরে ধীরে বলিল, বুঝেচি! আর জিজ্ঞেস কর্‌ব না। আমিও কোনমতে বল্‌ব না, কেন না কাল যখন তোমার হুঁস হবে, তখন নিজেই বুঝ্‌বে—এখন তুমি তোমাতে নেই।

নেশাখোর সব সহিতে পারে, পারে না শুধু তাহার বুদ্ধিভ্রষ্টতার উল্লেখ সহিতে। ভয়ানক ক্রুদ্ধ হইয়া বলিতে লাগিল, গাঁজা খেয়েছি, এই বলচিস্ ত? গাঁজা আজ আমি নূতন খাই নি যে, জ্ঞান হারিয়েচি। বরং জ্ঞান হারিয়েচিস্ তুই, তুই আর তোতে নেই।

বিরাজ তেমনি মুখের পানে চাহিয়া রহিল।

নীলাম্বর বলিল, কার চোখে ধূলো দিতে চাস্ বিরাজ? আমার? আমি অতি মূর্খ, তাই সেদিন পীতাম্বরের কোন কথা বিশ্বাস করি নি, কিন্তু সে ছোটভাই, যথার্থ ভায়ের কাজই করেছিল। নইলে কেন বলতে পারিস্ নে কোথা ছিলি? কেন মিছে কথা বল্‌লি—তুই ঘাটে ছিলি?

বিরাজের দুই চোখ এখন ঠিক পাগলের চক্ষুর মত ধক্ ধক্ করিতে লাগিল, তথাপি সে কণ্ঠস্বর সংযত করিয়া জবাব দিল, মিছে কথা বল্‌ছিলুম, এ কথা শুন্‌লে তুমি লজ্জা পাবে, দুঃখ পাবে, হয় ত তোমার খাওয়া হবে না তাই, কিন্তু সে ভয় মিছে—তোমার লজ্জা-সরমও নেই, তুমি আর মানুষও নেই। কিন্তু তুমি মিছে কথা বল নি? একটা পশুরও এত বড় ছল কর্‌তে লজ্জা হ’ত, কিন্তু তোমার হ’ল না! সাধু পুরুষ! রোগা স্ত্রীকে ঘরে একা ফেলে কোন শিষ্যের বাড়িতে তিন দিন ধ’রে গাঁজার ওপর গাঁজা খাচ্ছিলে বল!

নীলাম্বর আর সহিতে পারিল না। বলচি, বলিয়া হাতের কাছের শূন্য পাণের ডিবাটা বিরাজের মাথা লক্ষ্য করিয়া সজোরে নিক্ষেপ করিল। বড় ডিবা তাহার কপালে লাগিয়া ঝন্ ঝন্ করিয়া খুলিয়া নীচে পড়িল। দেখিতে দেখিতে তাহার চোখের কোণ বহিয়া, ঠোঁটের প্রান্ত দিয়া রক্তে মুখ ভাসিয়া উঠিল।

বিরাজ বাঁ হাতে কপাল টিপিয়া চেঁচাইয়া উঠিল—আমাকে মার্‌লে!

নীলাম্বরের ঠোঁট মুখ কাঁপিতে লাগিল, বলিল, না, মারি নি। কিন্তু দূর হ সুমুখ থেকে—ও মুখ আর দেখাস্ নে—অলক্ষ্মী দূর হয়ে যা!

বিরাজ উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, যাচ্চি। এক পা গিয়া হঠাৎ ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, কিন্তু সহ্য হবে ত? কাল যখন মনে পড়বে, জ্বরের উপর আমাকে মেরেচ—তাড়িয়ে দিয়েচ, আমি তিন দিন খাই নি, তবু এই অন্ধকারে তোমার জন্যে ভিক্ষা ক’রে এনেচি—সইতে পার্‌বে ত? এই অলক্ষ্মীকে ছেড়ে থাক্‌তে পার্‌বে ত?

রক্ত দেখিয়া নীলাম্বরের নেশা ছুটিয়া গিয়াছিল—সে মূঢ়ের মত চুপ করিয়া রহিল।

বিরাজ আঁচল দিয়া মুছিয়া বলিল, এই এক বছর যাই যাই কর্‌চি, কিন্তু তোমাকে ছেড়ে যেতে পারি নি। চেয়ে দেখ, দেহে আমার কিছু নেই, চোখে ভাল দেখ্‌তে পাই নে, এক পা চলতে পারি নে—আমি যেতুম না, কিন্তু স্বামী হয়ে যে অপবাদ আমাকে দিলে, আর আমি তোমায় মুখ দেখাব না। তোমার পায়ের নীচে মর্‌বার লোভ আমার সবচেয়ে বড় লোভ—সেই লোভটাই আমি কোনমতে ছাড়্‌তে পার্‌ছিলুম না—আজ ছাড়্‌লুম, বলিয়া কপাল মুছিতে মুছিতে খিড়কীর খোলা দোর দিয়া আর একবার অন্ধকারে বাগানের মধ্যে মিলাইয়া গেল।

নীলাম্বর কথা কহিতে চাহিল, কিন্তু জিভ্ নাড়িতে পারিল না। ছুটিয়া পিছনে যাইতে চাহিল, কিন্তু উঠিতে পারিল না। কোন্ মায়ামন্ত্রে তাহাকে অচল পাথরে রূপান্তরিত করিয়া দিয়া বিরাজ অদৃশ্য হইয়া গেল।

আজ একবার ওই সরস্বতীর দিকে চাহিয়া দেখ, ভয় করিবে। বৈশাখের সেই শীর্ণকায়া মৃদুপ্রবাহিনী শ্রাবণের শেষ দিনে কি খরবেগে দুই কুল ভাসাইয়া চলিয়াছে! যে কাল পাথরখণ্ডটার উপর একদিন বসন্ত-প্রভাতে দুটি ভাইবোনকে অসীম স্নেহে সুখে এক হইয়া বসিয়া থাকিতে দেখিয়াছিলাম, সেই কাল পাথরটার উপর বিরাজ আজিকার আঁধার রাত্রে কি হৃদয় লইয়া কাঁপিতে কাঁপিতে আসিয়া দাঁড়াইল! নীচে গভীর জলরাশি সুদৃঢ় প্রাচীর-ভিত্তিতে ধাক্কা খাইয়া আবর্ত্ত রচিয়া চলিয়াছে, সেই দিকে একবার ঝুঁকিয়া দেখিয়া সম্মুখে চাহিয়া রহিল। তাহার পায়ের নীচে কাল পাথর, মাথার উপর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, সুমুখে কাল জল, চারিদিকে গভীর কৃষ্ণ, স্তব্ধ বনানী—আর বুকের ভিতর জাগিতেছে তাদের চেয়ে কাল আত্মহত্যা-প্রবৃত্তি। সে সেইখানে বসিয়া পড়িয়া নিজের আঁচল দিয়া দৃঢ় করিয়া জড়াইয়া নিজের হাত-পা বাঁধিতে লাগিল।