বিরাজ বৌ · শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Chapter 10: অধ্যায় 10

মধ্যাহ্নে কেহ কোথাও নাই দেখিয়া ছোটবৌ কাঁদিতে কাঁদিতে বিরাজের পায়ের নীচে আসিয়া পড়িল। স্বামীর অপরাধের ভয়ে ব্যাকুল হইয়া এই দুই দিন ধরিয়া সে অনুক্ষণ এই সুযোগটুকু প্রতীক্ষা করিয়াছিল। কাঁদিয়া বলিল, শাপ-সম্পাত দিও না দিদি, আমার মুখ চেয়ে ওঁকে মাপ কর, ওঁর কিছু হ’লে আমি বাঁচব না।

বিরাজ হাত ধরিয়া তাহাকে তুলিয়া বিষণ্ণ গম্ভীর মুখে বলিল, আমি অভিসম্পাত দেব না বোন, আমার অনিষ্ট করবার সাধ্যও ওর নেই, কিন্তু তোর মত সতীলক্ষ্মীর দেহে বিনা দোষে হাত তুল্‌লে মা দুর্গা সহ্য করবেন না যে!

মোহিনী শিহরিয়া উঠিল। চোখ মুছিয়া বলিল, কি কর্‌ব দিদি ঐ তাঁর স্বভাব। যে দেবতা ওঁর দেহে অমন রাগ দিয়েছেন, তিনিই মাপ করবেন। তবুও এমন দেব-দেবতা নেই যে, এজন্য মানত করি নি; কিন্তু মহাপাপী আমি, আমার ডাকে কেউ কান দিলেন না। এমন একটা দিন যায় না দিদি, বলিয়া সে হঠাৎ থামিয়া গেল।

বিরাজ এতক্ষণ লক্ষ্য করে নাই যে, ছোটবৌর ডান রগের উপর একটা বাঁকা গাঢ় কাল দাগ পড়িয়াছে, সভয়ে বলিয়া উঠিল, তোর কপালে কি মারের দাগ না কি রে?

ছোটবৌ লজ্জিত মুখ হেঁট করিয়া ঘাড় নাড়িল।

কি দিয়ে মার্‌লে?

স্বামীর লজ্জায় মোহিনী মুখ তুলিতে পারিতেছিল না; নতমুখে মৃদুস্বরে বলিল, রাগ হলে ওঁর জ্ঞান থাকে না দিদি।

তা জানি, তবু কি দিয়ে মার্‌লে?

মোহিনী তেমনই নতমুখে থাকিয়াই বলিল, পায়ে চটিজুতা ছিল—

বিরাজ স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল—তাহার দুই চোখ দিয়া আগুন বাহির হইতে লাগিল। খানিক পরে চাপা বিকৃতকণ্ঠে বলিল, কি করে সহ্য করে রইলি ছোটবৌ?

ছোটবৌ একটুখানি মুখ তুলিয়া বলিল, আমার অভ্যাস হয়ে গেছে দিদি।

বিরাজ সে কথা যেন কানেই শুনিতে পাইল না, বিকৃত গলায় বলিল, আবার তারই জন্য তুই মাপ চাইতে এলি?

ছোটবৌ বড়জার মুখপানে চাহিয়া বলিল, হাঁ দিদি। তুমি প্রসন্ন না হলে ওঁর অকল্যাণ হবে। আর সহ্য করার কথা যদি বল্‌লে দিদি, সে তোমার কাছেই শেখা, আমার যা কিছু সবই তোমার পায়ে—

বিরাজ অধীর হইয়া উঠিল,—না ছোটবৌ, না, মিছে কথা বলিস্ নে—এ অপমান আমি সইতে পারি নে।

ছোটবৌ একটুখানি হাসিয়া বলিল, নিজের অপমান সইতে পারাটাই কি খুব বড় পারা দিদি? তোমার মত স্বামী-সৌভাগ্য সংসারে মেয়েমানুষের অদৃষ্টে জোটে না, তবুও তুমি যা সয়ে আছ সে সইতে গেলে আমরা গুঁড়ো হয়ে যাই। তাঁর মুখে হাসি নেই, মনের ভিতর সুখ নেই, তোমায় রাত-দিন চোখে দেখ্‌তে হচ্চে; অমন স্বামীর অত কষ্ট সহ্য কর্‌তে তুমি ছাড়া আর কেউ পার্‌ত না দিদি।

বিরাজ মৌন হইয়া রহিল।

ছোটবৌ খপ্ করিয়া হাত দিয়া তাহার পা দুটো চাপিয়া বলিল, বল, ওঁকে ক্ষমা কর্‌লে? তোমার মুখ থেকে না শুন্‌লে আমি কিছুতেই ছাড়ব না—তুমি প্রসন্ন না হ’লে ওঁকে কেউ রক্ষে কর্‌তে পারবে না দিদি!

বিরাজ পা সরাইয়া লইয়া হাত দিয়া ছোটবৌর চিবুক স্পর্শ করিয়া বলিল, মাপ কর্‌লুম।

ছোটবৌ আর একবার পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া আনন্দিত মুখে চলিয়া গেল।

কিন্তু বিরাজ অভিভূতের মত সেইখানে বহুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল। তাহার হৃদয়ের অন্তস্তল হইতে কে যেন বার বার ডাক দিয়া বলিতে লাগিল, এই দেখে শেখ্ বিরাজ!

সেই অবধি অনেকদিন পর্য্যন্ত ছোটবৌ এ-বাড়িতে আসে নাই বটে, কিন্তু একটি চোখ একটি কান এই দিকেই পাতিয়া রাখিয়াছিল। আজ বেলা একটা বাজে, সে অতি সাবধানে এ-দিকে ও-দিকে চাহিয়া এ-বাড়িতে আসিয়া প্রবেশ করিল।

বিরাজ গালে হাত দিয়া রান্নাঘরের দাওয়ার একধারে স্তব্ধ হইয়া বসিয়াছিল, তেমনই বসিয়া রহিল।

ছোটবৌ কাছে বসিয়া পায়ে হাত দিয়া নিজের মাথায় স্পর্শ করিয়া আস্তে আস্তে বলিল, দিদি কি পাগল হয়ে যাচ্চ?

বিরাজ মুখ ফিরাইয়া তীব্রকণ্ঠে উত্তর করিল, তুই হ’তিস্ নে?

ছোটবৌ বলিল, তোমার সঙ্গে তুলনা করে আমাকে অপরাধী ক’র না দিদি, এই দুটি পা’র ধুলোর যোগ্যও আমি নই, কিন্তু তুমি বল, কেন এমন হচ্চ? কেন বট্‌ঠাকুরকে আজ খেতে দিলে না।

আমি ত খেতে বারণ করি নি!

ছোটবৌ বলিল, বারণ কর নি সে কথা ঠিক, কিন্তু কেন একবার গেলে না? তিনি খেতে বসে কতবার ডাক্‌লেন, একটা সাড়া পর্য্যন্ত দিলে না। আচ্ছা তুমিই বল, এতে দুঃখ হয় কি না? একটিবার কাছে গেলে ত তিনি ভাত ফেলে উঠে যেতেন না।

তথাপি বিরাজ মৌন হইয়া রহিল।

ছোটবৌ বলিতে লাগিল, হাত জোড়া ছিল ব’লে আমাকে ত ভুলাতে পার্‌বে না দিদি! চিরকাল সমস্ত কাজ ফেলে রেখে তাঁকে সুমুখে ব’সে খাইয়েচ—সংসারে এর চেয়ে বড় কাজ তোমার কোনদিন ছিল না, আজ—

কথা শেষ না হইবার পূর্ব্বেই বিরাজ উন্মাদের মত তাহার একটা হাত ধরিয়া সজোরে টান দিয়া বলিল, তবে দেখ্‌বি আয়। বলিয়া টানিয়া রান্নাঘরের মাঝখানে দাঁড় করাইয়া হাত দিয়া দেখাইয়া বলিল, ঐ চেয়ে দেখ্‌।

ছোটবৌ চাহিয়া দেখিল, একটা কাল পাথরে অপরিষ্কৃত মোটা চালের ভাত এবং তাহারই একধারে অনেকটা কলমি-শাকসিদ্ধ, আর কিছুই নাই।

আজ কোন উপায় না দেখিয়া বিরাজ এইগুলি নদী হইতে ছিঁড়িয়া আনিয়া সিদ্ধ করিয়া দিয়াছিল।

দেখিতে দেখিতে ছোটবৌর দুচোখ বাহিয়া ঝরঝর করিয়া অশ্রু ঝরিয়া পড়িল, কিন্তু বিরাজের চোখে জলের আভাস মাত্র নাই। দুই জায়ে নিঃশব্দে মুখোমুখি চাহিয়া রহিল।

বিরাজ অবিকৃতকণ্ঠে বলিল, তুইও ত মেয়েমানুষ, তোকেও ত রেঁধে স্বামীর পাতে ভাত দিতে হয়, তুই বল পৃথিবীতে কেউ কি সুমুখে বসে স্বামীর ওই খাওয়া চোখে দেখ্‌তে পারে? আগে বল্, ব’লে যা তোর মুখে আসে, তাই ব’লে আমাকে গাল দে, আমি কথা ক’ব না।

ছোটবৌ একটি কথাও বলিতে পারিল না, তাহার চোখ দিয়া তেমনই অঝোরে জল ঝরিয়া পড়িতে লাগিল।

বিরাজ বলিতে লাগিল, দৈবাৎ রান্নার দোষে যদি কোনদিন তাঁর একটি ভাতও কম খাওয়া হয়েছে ত সারাদিন বুকের ভিতর আমার কি ছুঁচ বিঁধেচে, সে আর কেউ জানে না, তুই তো জানিস্ ছোটবৌ, আজ তাঁর ক্ষিদের সময় আমাকে ঐ এনে দিতে হয়—তাও বুঝি আর জোটে না—আর সে সহ্য করিতে পারিল না, ছোটজার বুকের উপর আছাড় খাইয়া পড়িয়া দুই হাতে গলা জড়াইয়া ফুঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। তারপর, সহোদরার মত এই দুই রমণী বহুক্ষণ পর্য্যন্ত বাহুপাশে আবদ্ধ হইয়া রহিল, বহুক্ষণ ধরিয়া এই দুই অভিন্ন নারীহৃদয় নিঃশব্দ অশ্রুজলে ভাসিয়া যাইতে লাগিল। তারপর বিরাজ মাথা তুলিয়া বলিল, না তোকে লুকাব না, কেন না, আমার দুঃখ বুঝ্‌তে তুই ছাড়া আর কেউ নেই। আমি অনেক ভেবে দেখেছি, আমি স’রে না গেলে ওঁর কষ্ট যাবে না। কিন্তু থেকে ও-মুখ না দেখে একটা দিনও কাটাতে পার্‌ব না। আমি যাব, বল্ আমি গেলে ওঁকে দেখবি?

ছোটবৌ চোখ তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কোথা যাবে?

বিরাজের শুষ্ক ওষ্ঠাধরে কঠিন শীতল হাসির রেখা পড়িল, বোধ করি একবার সে দ্বিধাও করিল, তারপর বলিল, কি করে জান্‌ব বোন কোথায় যেতে হয়, শুনি ওর চেয়ে পাপ নাকি আর নেই, তা সে যাই হোক্‌ এ জ্বালা এড়াব ত!

এবার মোহিনী বুঝিতে পারিয়া শিহরিয়া উঠিল। ব্যস্ত হইয়া তাহার মুখে হাত চাপিয়া দিয়া বলিয়া উঠিল, ছি ছি, ও কথা মুখে এনো না দিদি! আত্মহত্যার কথা যে বলে তার পাপ, যে কানে শোনে তার পাপ, ছি ছি কি হয়ে গেলে তুমি!

বিরাজ হাত সরাইয়া দিয়া বলিল, তা জানি নে। শুধু জানি, ওঁকে আর খেতে দিতে পারচি নে। আজ আমাকে ছুঁয়ে কথা দে, তুই যেমন ক’রে পারিস্ দুই ভায়ে মিল করে দিবি।

কথা দিলুম, বলিয়া মোহিনী সহসা বসিয়া পড়িয়া বিরাজের পা চাপিয়া ধরিয়া বলিল, তবে আমাকেও আজ একটা ভিক্ষে দেবে বল?

বিরাজ জিজ্ঞাসা করিল, কি?

তবে এক মিনিট সবুর কর আমি আস্‌ছি, বলিয়া সে পা বাড়াইতেই বিরাজ আঁচল ধরিয়া ফেলিয়া বলিল, না যাস্ নে। আমি একটি তিল পর্য্যন্ত কারু কাছে নেব না।

কেন নেবে না?

বিরাজ প্রবলবেগে মাথা নাড়িয়া বলিল, না, সে কোনমতেই হবে না, আর আমি কারও কিছু নিতে পার্‌ব না।

ছোটবৌ ক্ষণেকের জন্য স্থিরদৃষ্টিতে বড়জার আকস্মিক উত্তেজনা লক্ষ্য করিল। তারপর সেইখানে বসিয়া পড়িয়া বলিল, তবে শোন দিদি। কেন জানি নে, আগে তুমি আমাকে ভালবাসতে না, ভাল ক’রে কথা কইতে না, সেজন্যে কত যে লুকিয়ে বসে কেঁদেচি, কত দেবদেবীকে ডেকেচি, তার সংখ্যা নাই। আজ তাঁরাও মুখ তুলে চেয়েছেন, তুমি ছোটবোন ব’লে ডেকেচ। এখন একবার ভেবে দেখ, আমাকে এই অবস্থায় দেখে কিছু না কর্‌তে পেলে তুমি কি রকম ক’রে বেড়াতে।

বিরাজ জবাব দিতে পারিল না। মুখ নীচু করিয়া রহিল।

ছোটবৌ উঠিয়া গিয়া অনতিকাল পরে একটা বড় ধামায় সর্ব্বপ্রকার আহার্য্য পূর্ণ করিয়া আনিয়া নামাইয়া রাখিল।

বিরাজ স্থির হইয়া দেখিতেছিল, কিন্তু সে যখন কাছে আসিয়া তাহার আঁচলের একটা খুঁট তুলিয়া একটা মোহর বাঁধিতে লাগিল, তখন সে আর থাকিতে না পারিয়া সজোরে ঠেলিয়া দিয়া চেঁচাইয়া উঠিল, না, ও কিছুতেই হবে না—ম’রে গেলেও না।

মোহিনী ধাক্কা সামলাইয়া লইয়া মুখ তুলিয়া বলিল, হবে না কেন, নিশ্চয় হবে। এ আমার বট্‌ঠাকুর আমাকে বিয়ের সময় দিয়েছিলেন। বলিয়া আঁচলে বাঁধিয়া দিয়া আর একবার হেঁট হইয়া পায়ের ধুলা মাথায় লইয়া বাড়ী চলিয়া গেল।