বিরাজ বৌ · শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Chapter 1: অধ্যায় 1

হুগলী জেলার সপ্তগ্রামে দুই ভাই নীলাম্বর ও পীতাম্বর চক্রবর্ত্তী বাস করিত। ও অঞ্চলে নীলাম্বরের মত মড়া পোড়াইতে, কীর্ত্তন গায়িতে, খোল বাজাইতে এবং গাঁজা খাইতে কেহ পারিত না। তাহার উন্নত গৌরবর্ণ দেহে অসাধারণ শক্তি ছিল। গ্রামের মধ্যে পরোপকারী বলিয়া তাহার যেমন খ্যাতি ছিল, গোঁয়ার বলিয়া তেমনই একটা অখ্যাতিও ছিল। কিন্তু ছোটভাই পীতাম্বর সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির লোক। সে খর্ব্বকায় এবং কৃশ। মানুষ মরিয়াছে শুনিলেই তাহার সন্ধ্যার পর গা কেমন করিত। দাদার মত অমন মূর্খও নয়, গোঁয়ারতমির ধার দিয়াও সে চলিত না। সকাল-বেলা ভাত খাইয়া দপ্তর বগলে করিয়া হুগলীর আদালতের পশ্চিম দিকের একটা গাছতলায় গিয়া বসিত এবং সমস্ত দিন আর্জি লিখিয়া যা উপার্জ্জন করিত, সন্ধ্যার পূর্ব্বেই বাড়ী ফিরিয়া সেগুলি বাক্সে বন্ধ করিয়া ফেলিত। রাত্রে ঘরের দরজা-জানালা স্বহস্তে বন্ধ করিত এবং স্ত্রীকে দিয়া পুনঃ পুনঃ পরীক্ষা করাইয়া লইয়া তবে ঘুমাইত।

আজ সকালে নীলাম্বর চণ্ডীমণ্ডপের একধারে বসিয়া তামাক খাইতেছিল, তাহার অনুঢ়া ভগিনী হরিমতি নিঃশব্দে আসিয়া পিঠের কাছে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া দাদার পিঠে মুখ লুকাইয়া কাঁদিতে লাগিল। নীলাম্বর হুঁকাটা দেওয়ালে ঠেস দিয়া রাখিয়া, আন্দাজ করিয়া এক হাত তাহার বোনের মাথার উপর রাখিয়া, সস্নেহে কহিল, সকাল-বেলাই কান্না কেন দিদি?

হরিমতি মুখ রগড়াইয়া পিঠময় চোখের জল মাখাইয়া দিতে দিতে জানাইল যে, বৌদি গাল টিপিয়া দিয়াছে এবং ‘কাণী’ বলিয়া গাল দিয়াছে।

নীলাম্বর হাসিয়া বলিল, তোমাকে ‘কাণী’ বলে? অমন দুটি চোখ থাক্‌তে যে কাণী বলে, সেই কাণী। কিন্তু গাল টিপে দেয় কেন?

হরিমতি কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, মিছিমিছি।

মিছিমিছি? আচ্ছা, চল ত দেখি, বলিয়া বোনের হাত ধরিয়া ভিতরে আসিয়া ডাকিল, বিরাজ-বৌ?

বড়বধুর নাম বিরাজ। তাহার নয় বৎসর বয়সে বিবাহ হইয়াছিল বলিয়া সকলে বিরাজ-বৌ বলিয়া ডাকিত। এখন তাহার বয়স উনিশ-কুড়ি। শাশুড়ীর মরণের পর হইতে সে গৃহিণী। বিরাজ অসামান্যা সুন্দরী। চার-পাঁচ বৎসর পূর্ব্বে তাহার একটি পুত্র-সন্তান জন্মিয়া আঁতুড়েই মরিয়াছিল, সেই অবধি সে নিঃসন্তান। রান্নাঘরে কাজ করিতেছিল, স্বামীর ডাকে বাহিরে আসিয়া ভাইবোনকে একসঙ্গে দেখিয়া জ্বলিয়া বলিল, পোড়ারমুখি আবার নালিশ কর্‌তে গিয়েছিলি?

নীলাম্বর বলিল, কেন যাবে না? তুমি ‘কাণী’ বলেছ, সেটা তোমার মিছে কথা। কিন্তু তুমি গাল টিপে দিলে কেন?

বিরাজ কহিল, অত বড় মেয়ে, ঘুম থেকে উঠে চোখে মুখে জল দেওয়া নেই, কাপড় ছাড়া নেই, গোয়ালে ঢুকে বাছুর খুলে দিয়ে হাঁ ক’রে দাঁড়িয়ে দেখ্‌ছে। আজ এক ফোঁটা দুধ পাওয়া গেল না। ওকে মারা উচিত।

নীলাম্বর বলিল, না। ঝিকে গয়লা-বাড়ী পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু তুমি দিদি, হঠাৎ বাছুর খুলে দিতে গেলে কেন? ও কাজটা ত তোমার নয়!

হরিমতি দাদার পিছনে দাঁড়াইয়া আস্তে আস্তে বলিল, আমি মনে করেছি দুধ দোয়া হয়ে গেছে।

আর কোন দিন মনে ক’রো! বলিয়া বিরাজ রান্নাঘরে ঢুকিতে যাইতেছিল, নীলাম্বর হাসিয়া বলিল, তুমিও একদিন ওর বয়সে মায়ের পাখী উড়িয়ে দিয়েছিলে। খাঁচার দোর খুলে দিয়ে মনে করেছিলে, খাঁচার পাখী উড়তে পারে না। মনে পড়ে?

বিরাজ ফিরিয়া দাঁড়াইয়া হাসিমুখে বলিল, পড়ে; কিন্তু ও বয়সে নয়—আরও ছোট ছিলাম। বলিয়া কাজে চলিয়া গেল।

হরিমতি বলিল, চল না দাদা, বাগানে গিয়ে দেখি, আম পাক্‌ল কি না।

তাই চল দিদি।

যদু চাকর ভিতরে ঢুকিয়া বলিল, নারাণ ঠাকুরদা ব’সে আছেন।

নীলাম্বর একটু অপ্রতিভ হইয়া মৃদুস্বরে বলিল, এর মধ্যেই এসে বসে আছেন?

রান্নাঘরের ভিতর হইতে বিরাজ এ কথা শুনিতে পাইয়া দ্রুতপদে বাহিরে আসিয়া চেঁচাইয়া বলিল, যেতে ব’লে দে খুড়োকে। স্বামীর প্রতি চাহিয়া বলিল, সকাল-বেলাতেই যদি ও-সব খাবে ত আমি মাথা খুঁড়ে মরব। কি সব হচ্ছে আজ-কাল!

নীলাম্বর জবাব দিল না, নিঃশব্দে ভগিনীর হাত ধরিয়া খিড়কির দ্বার দিয়া বাগানে চলিয়া গেল।

এই বাগানটির এক প্রান্ত দিয়া শীর্ণকায়া সরস্বতী নদীর মৃদু স্রোতটুকু গঙ্গাযাত্রীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মত বহিয়া যাইতেছিল। সর্ব্বাঙ্গ শৈবালে পরিপূর্ণ; শুধু মাঝে মাঝে গ্রামবাসীরা জল আহরণের জন্য কূপ খনন করিয়া রাখিয়া গিয়াছে। তাহারই আশে-পাশে শৈবালমুক্ত অগভীর তলদেশের বিভক্ত শুক্তিগুলি স্বচ্ছ জলের ভিতর দিয়া অসংখ্য মাণিক্যের মত সূর্য্যালোকে জ্বলিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছিল। তীরে এক খণ্ড কাল পাথর সমীপস্থ সমাধিস্তূপের প্রাচীর-গাত্র হইতে কোন এক অতীত দিনের বর্ষার খরস্রোতে স্খলিত হইয়া আসিয়া পড়িয়াছিল। এই বাড়ীর বধুরা প্রতি সন্ধ্যায় তাহারই একাংশে মৃতাত্মার উদ্দেশে দীপ জ্বালিয়া দিয়া যাইত। সেই পাথরখানির একধারে আসিয়া নীলাম্বর ছোটবোনটির হাত ধরিয়া বসিল। নদীর উভয় তীরেই বড় বড় আমবাগান এবং বাঁশঝাড়, দুই-একটা বহু প্রাচীন অশ্বত্থ বট নদীর উপর পর্য্যন্ত ঝুঁকিয়া পড়িয়া শাখা মেলিয়া দিয়াছে। ইহাদের শাখায় কতকাল কত পাখী নিরুদ্বেগে বাসা বাঁধিয়াছে, কত শাবক বড় করিয়াছে, কত ফল খাইয়াছে; তাহারই ছায়ায় বসিয়া ভাই-বোন ক্ষণকাল চুপ করিয়া রহিল।

হঠাৎ হরিমতি দাদার ক্রোড়ের কাছে আরও একটু সরিয়া আসিয়া বলিল, আচ্ছা দাদা, বৌদি কেন তোমাকে বোষ্টমঠাকুর ব’লে ডাকে?

নীলাম্বর গলায় তুলসীর মালা দেখাইয়া হাসিয়া বলিল, আমি বোষ্টম ব’লেই ডাকে।

হরিমতি অবিশ্বাস করিয়া বলিল, যাঃ—তুমি কেন বোষ্টম হবে? তারা ত ভিক্ষে করে। আচ্ছা, ভিক্ষে কেন করে দাদা?

নেই ব’লেই করে।

হরিমতি মুখপানে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কিছু নেই তাদের? তাদের পুকুর নেই, বাগান নেই, ধানের গোলা কিচ্ছুটি নেই?

নীলাম্বর সস্নেহে হাত দিয়া বোনটির মাথার চুলগুলি নাড়িয়া দিয়া বলিল, কিছুটি নেই দিদি, কিচ্ছুটি নেই—বোষ্টম হ’লে কিচ্ছুটি থাকতে নেই।

হরিমতি বলিল, তবে সবাই কেন তাদের কিছু কিছু দেয় না?

নীলাম্বর বলিল, তোর দাদাই কি কিছু তাদের দিয়েছে রে?

কেন দাও না দাদা, আমাদের ত এত আছে?

নীলাম্বর সহাস্যে বলিল, তবুও তোর দাদা দিতে পারে না; কিন্তু তুই যখন রাজার বৌ হবি দিদি, তখন দিস্।

হরিমতি বালিকা হইলেও কথাটায় লজ্জা পাইল। দাদার বুকে মুখ লুকাইয়া বলিল, যাঃ।

নীলাম্বর দুই হাতে চাপিয়া ধরিয়া তাহার মস্তক চুম্বন করিল। মা-বাপ-মরা এই ছোটবোনটিকে যে কত ভালবাসিত তাহার সীমা ছিল না। তিন বছরের শিশুকে বড়-বৌ-ব্যাটার হাতে সঁপিয়া দিয়া তাহাদের বিধবা জননী সাত বৎসর পূর্ব্বে স্বর্গারোহণ করে। সেই দিন হইতে নীলাম্বর ইহাকে মানুষ করিয়াছে। সমস্ত গ্রামের রোগীর সেবা করিয়াছে, মড়া পোড়াইয়াছে, কীর্ত্তন গাহিয়াছে, গাঁজা খাইয়াছে; কিন্তু জননীর শেষ আদেশটুকু এক মুহূর্ত্তের জন্য অবহেলা করে নাই। এমন করিয়া বুকে করিয়া মানুষ করিয়াছিল বলিয়াই হরিমতি মায়ের মত অসঙ্কোচে দাদার বুকে মুখ রাখিয়া চুপ করিয়া রহিল।

অদৃশ্যে পুরাতন ঝির গলা শোনা গেল—পুঁটি, বৌমা ডাক্‌ছেন, দুধ খাবে এস।

হরিমতি মুখ তুলিয়া মিনতির স্বরে বলিল, দাদা, তুমি ব’লে দাও না এখন দুধ খাব না।

কেন খাবে না দিদি?

হরিমতি বলিল, এখনও আমার একটুও ক্ষিদে পায় নি।

নীলাম্বর হাসিয়া বলিল, সে আমি যেন বুঝ্‌লুম, কিন্তু যে গাল টিপে দেবে, সে ত বুঝবে না!

দাসী অলক্ষ্যে থাকিয়া আবার ডাক দিল, পুঁটি!

নীলাম্বর তাহাকে তাড়াতাড়ি তুলিয়া দিয়া বলিল, যা তুই কাপড় ছেড়ে দুধ খেয়ে আয় বোন, আমি ব’সে আছি।

হরিমতি অপ্রসন্ন মুখে ধীরে ধীরে চলিয়া গেল।

সেই দিন দুপুর-বেলা বিরাজ স্বামীকে ভাত বাড়িয়া দিয়া অদূরে বসিয়া পড়িয়া বলিল, আচ্ছা, তুমিই বলে দাও, আমি কি দিয়ে রোজ রোজ তোমার পাতে ভাত দি? তুমি এ খাবে না, সে খাবে না—শেষকালে কি না, মাছ পর্য্যন্ত ছেড়ে দিলে!

নীলাম্বর খাইতে বসিয়া বলিল, এই ত এত তরকারি হয়েছে!

এত কত! ঐ থোড়-বড়ি খাড়া, আর খাড়া-বড়ি থোড়! এ দিয়ে কি পুরুষমানুষ খেতে পারে? এ সহর নয় যে, সব জিনিস পাওয়া যাবে; পাড়াগাঁ, এখানে সম্বলের মধ্যে ঐ পুকুরের মাছ—তাও কি না তুমি ছেড়ে দিলে! পুঁটি, কোথায় গেলি? বাতাস কর্‌বি আয়—না, সে হবে না—আজ যদি একটি ভাত পড়ে থাকে ত তোমার পায়ে মাথা খুঁড়ে মর্‌ব।

নীলাম্বর হাসিমুখে নিঃশব্দে আহার করিতে লাগিল।

বিরাজ রাগিয়া বলিল, কি হাস, আমার গা জ্বালা করে। দিন দিন তোমার খাওয়া কমে আস্‌ছে—সে খবর রাখ? গলার হাড় বেরোবার যো হচ্ছে, সে দিকে চেয়ে দেখ?

নীলাম্বর বলিল, দেখচি, ও তোমার মনের ভুল।

বিরাজ কহিল, মনের ভুল? তুমি গুণে একটি ভাত খেলে আমি বলে দিতে পারি, রতি পরিমাণ রোগা হলে আমি গায়ে হাত দিয়ে ধ’রে দিতে পারি তা জান? যা ত পুঁটি, পাখা রেখে রান্নাঘর থেকে তোর দাদার দুধ নিয়ে আয়।

হরিমতি একধারে দাঁড়াইয়া বাতাস সুরু করিয়াছিল, পাখা রাখিয়া দুধ আনিতে গেল।

বিরাজ পুনরায় কহিল, ধর্ম্মকর্ম্ম কর্‌বার ঢের সময় আছে। আজ ও-বাড়ীর পিসিমা এসেছিলেন, শুনে বললেন, এত কম বয়সে মাছ ছেড়ে দিলে চোখের জ্যোতি ক’মে যায়, গায়ের জোর ক’মে যায়―না না, সে হবে না—শেষকালে কি হ’তে কি হবে, তোমাকে মাছ ছাড়্‌তে আমি দেব না।

নীলাম্বর হাসিয়া ফেলিয়া বলিল, আমার হ’য়ে তুই বেশী ক’রে খাস্ তা হ’লেই হবে।

বিরাজ রাগিয়া গিয়া বলিল, হাড়ি-কেওড়ার মত আবার তুইতোকারি?

নীলাম্বর অপ্রতিভ হইয়া বলিল, মনে থাকে না রে! ছেলে-বেলার অভ্যাস যেতে চায় না—কত তোর কান ম’লে দিয়েছি, মনে আছে?

বিরাজ মুখ টিপিয়া হাসিয়া বলিল, মনে আবার নেই? ছোটটি পেয়ে আমার উপর কম অত্যাচার করেচ তুমি! বাবাকে লুকিয়ে, মাকে লুকিয়ে, আমাকে দিয়ে তুমি কত তামাক সাজিয়েচ! কত শয়তান লোক তুমি!

নীলাম্বর হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল—আজও সেই সব মনে আছে! কিন্তু তখন থেকেই তোকে ভালবাসতাম।

বিরাজ হাসি চাপিয়া বলিল, জানি; চুপ কর, পুঁটি আস্‌চে।

হরিমতি দুধের বাটি পাতের কাছে রাখিয়া দিয়া পাখা লইয়া বাতাস করিতে লাগিল। বিরাজ উঠিয়া গিয়া হাত ধুইয়া আসিয়া স্বামীর সন্নিকটে বসিয়া পড়িয়া বলিল, আমাকে পাখাটা দে পুঁটি—যা তুই খেল্‌গে যা।

পুঁটি চলিয়া গেলে বিরাজ বাতাস করিতে করিতে বলিল, সত্যি বল্‌চি—অত ছোট-বেলায় বিয়ে হওয়া ভাল নয়।

নীলাম্বর জিজ্ঞাসা করিল, কেন নয়? আমি ত বলি, মেয়েদের খুব ছোটবেলায় বিয়ে হওয়াই ভাল।

বিরাজ মাথা নাড়িয়া বলিল, না। আমার কথা আলাদা, কেন না আমি তোমার হাতে পড়েছিলাম। তা ছাড়া, আমার দুষ্টু বজ্জাত জা-ননদ ছিল না—আমি দশ বছর থেকেই গিন্নী। কিন্তু আর পাঁচজনের ঘরেও দেখ্‌ছি ত, ঐ যে ছোট-বেলা থেকে বকা-ঝকা মার-ধোর শুরু হয়ে যায়—শেষে বড় হলেও সে দোষ ঘোচে না—বকা-ঝকা থামে না। সেই জন্যেই ত আমি আমার পুঁটির বিয়ের নামটী করি নে, নইলে পরশুও রাজেশ্বরীতলার ঘোষালদের বাড়ী থেকে ঘট্‌কী এসেছিল; সর্ব্বাঙ্গে গয়না—হাজার টাকা নগদ—তবুও আমি বলি, না—আরও দুবছর থাক।

নীলাম্বর মুখ তুলিয়া আশ্চর্য্য হইয়া বলিল, তুই কি পণ নিয়ে মেয়ে বেচবি না কি রে?

বিরাজ বলিল, কেন নেব না? আমার একটা ছেলে থাক্‌লে টাকা দিয়ে মেয়ে ঘরে আন্‌তে হ’ত না? আমাকে তোমরা তিনশ টাকা দিয়ে কিনে আন নি? ঠাকুরপোর বিয়েতে পাঁচশ টাকা দিতে হয় নি? না না, তুমি আমার ও-সব কথায় থেক না—আমাদের যা নিয়ম, আমি তাই কর্‌ব।

নীলাম্বর অধিকতর আশ্চর্য্য হইয়া বলিল, আমাদের নিয়য় মেয়ে বেচা—এ খবর কে তোকে দিলে? আমরা পণ দিই বটে, কিন্তু মেয়ের বিয়েতে এক পয়সাও নিই নে—আমি পুঁটিকে দান কর্‌ব।

বিরাজ স্বামীর মুখ-চোখের ভাব লক্ষ্য করিয়া হঠাৎ হাসিয়া ফেলিয়া বলিল, আচ্ছা, তাই ক’রো—এখন খাও—ছুতো ক’রে যেন উঠে যেও না।

নীলাম্বর হাসিয়া ফেলিয়া বলিল, আমি ছুতো ক’রে উঠে যাই?

বিরাজ কহিল, না—একদিনও না। ও দোষটি তোমার শত্তুরেও দিতে পারবে না। এ জন্যে কতদিন যে আমাকে উপোস ক’রে কাটাতে হয়েচে, সে ছোটবৌ জানে। ও কি? খাওয়া হয়ে গেল নাকি?

বিরাজ ব্যস্ত হইয়া পাখাটা ফেলিয়া দিয়া দুধের বাটি চাপিয়া ধরিয়া বলিল, মাথা খাও, উঠ না—ও পুঁটি শীগ্‌গির যা—ছোটবৌর কাছ থেকে দুটো সন্দেশ নিয়ে আয়—না না, ঘাড় নাড়্‌লে হবে না—তোমার কখ্‌খন পেট ভরে নি― মাইরি বলচি, আমি তা হ’লে ভাত খাব না—কাল রাত্তির একটা পর্য্যন্ত জেগে সন্দেশ তৈরী করেচি।

হরিমতি একটা রেকাবিতে সবগুলা সন্দেশ লইয়া ছুটিয়া আসিয়া পাতের কাছে রাখিয়া দিল।

নীলাম্বর হাসিয়া উঠিয়া বলিল, আচ্ছা, তুমিই বল, এতগুলো সন্দেশ এখন খেতে পারি?

বিরাজ মিষ্টান্নের পরিমাণ দেখিয়া মুখ নীচু করিয়া বলিল, গল্প কর্‌তে কর্‌তে অন্যমনস্ক হয়ে খাও—পার্‌বে।

তবু খেতে হবে?

বিরাজ কহিল, হাঁ। হয় মাছ ছাড়তে পাবে না, না হয় এ জিনিসটা একটু বেশি ক’রে খেতেই হবে।

নীলাম্বর, রেকাবটি টানিয়া লইয়া বলিল, তোর এই খাবার জুলুমের ভয়ে ইচ্ছে করে, বনে গিয়ে বসে থাকি।

পুঁটি বলিয়া উঠিল, আমাকেও দাদা—

বিরাজ ধমক দিয়া উঠিল, চুপ কর্ পোড়ারমুখি, খাবি নে ত বাঁচবি কি ক’রে? এই নালিশ করা বেরুবে শ্বশুরবাড়ী গিয়ে।